নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 2 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • আলমগীর কবির
  • মিঠুন বিশ্বাস

নতুন যাত্রী

  • চয়ন অর্কিড
  • ফজলে রাব্বী খান
  • হূমায়ুন কবির
  • রকিব খান
  • সজল আল সানভী
  • শহীদ আহমেদ
  • মো ইকরামুজ্জামান
  • মিজান
  • সঞ্জয় চক্রবর্তী
  • ডাঃ নেইল আকাশ

আপনি এখানে

রমজান-মাসে চাঁদাবাজি, ভিক্ষাবৃত্তি ও রেডিমেট বেহেশতো বেচা-কেনার রাজনীতি


রমজান-মাসে চাঁদাবাজি, ভিক্ষাবৃত্তি ও রেডিমেট বেহেশতো বেচা-কেনার রাজনীতি
সাইয়িদ রফিকুল হক

রমজান-মাস পৃথিবীর সকল মুসলমানের কাছেই অতিপবিত্র একটি মাস। একজন মুসলমান হিসাবে আমার নিজের কাছেও মাসটি বিশেষ মর্যাদার। বছরের ১২টি মাস আমরা নিয়মিত নামাজআদায় করার চেষ্টা করে থাকি। আমাদের ইসলামধর্মপালনের মূল হাতিয়ার এখন নামাজ। অর্থাৎ, কেউ যদি একবার নিয়মিত মসজিদে নামাজ পড়ে, আর সে সবাইকে জানিয়ে ‘নামাজী’ হতে পারে—তবে তার মতো ধার্মিক বুঝি এই পৃথিবীতে আর নাই! সে এই নামাজ দিয়েই মহান আল্লাহর আটটি বেহেশতো একচান্সে কিনে ফেলার যোগ্যতাও অর্জন করে! আমাদের মুসলমানসমাজে এখন নামাজ পড়লেই সে মুসলমান! তার আর-কিছুর প্রয়োজন নাই! এইরকম একটি বদ্ধধারণা আজ সকলের মধ্যে। কিন্তু সে যে নিয়মিত-লোকদেখানো নামাজ পড়েও আজ মানুষ খুন করছে; ধর্ষণ করছে; কাজের মেয়ের সঙ্গে নিয়মিত জিনাব্যভিচার করছে; মসজিদ-নামাজ থেকে বেরিয়েই মদ্যপান করছে; নিয়মিত মাদকদ্রব্যসেবন করছে; মাদকদ্রব্যের ব্যবসা করছে; অফিসে নিয়মিত ঘুষ খাচ্ছে; পরের জমি দখল করছে; ভূমিদস্যু হচ্ছে; খাসজমি বা সরকারি-জমি দখল করছে; রাজনৈতিক কারণে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য তাদের কাফের, নাস্তিক, মুরতাদ বলে অভিহিত করছে; ইসলামের নামে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হত্যা করছে; ইসলামের নামে মানুষহত্যা করছে; সুদ-ঘুষের কারবার করছে; নারীর প্রতি অমানবিক আচরণ প্রকাশ করাসহ নারীনির্যাতন করছে; দেশের বিরুদ্ধে দেশবিরোধীঅপশক্তির সঙ্গে নিয়মিত অকাজ করছে! তারপরও কি এইসব লোক শুধু নামাজের জোরে মুসলমান? কিন্তু এরা তো মানুষই না! এরা মুসলমান হয় কীভাবে? এরা ধর্মের নামে মানুষকে শুধুই ধোঁকা দিচ্ছে।
আজ একশ্রেণীর মুসলমান শুধু নামাজ দিয়ে সবকিছুকে হালাল করতে চাচ্ছে।

রমজান-মাস এলে এইশ্রেণীর মুসলমানদের অপতৎপরতা আরও বেড়ে যায়। এরা ঘরে-বাইরে সবসময় নিজেদের রোজাদার-ধার্মিক-মুসলমান প্রমাণের অপচেষ্টা করে থাকে। কিন্তু এরা এতোবড় ভণ্ড যে, এই পবিত্র রমজান-মাসেও একদিন ঘুষখাওয়া ছাড়েনি। এরা ঘুষের টাকায় ইফতারমাহফিল করে, রোজাদার খাওয়ায়, ঘুষের টাকায় বেশি সওয়াবের আশায় মক্কায় যায় ওমরাহ-হজ্জ-পালন করতে, আর ঘুষ খেয়ে জমানো টাকায় রমজান-মাসে বেশি সওয়াবের আশায় জাকাত প্রদান করে থাকে!

হাদিসে আছে: রমজান-মাসে সবকিছুতে নাকি ২৭গুন সওয়াব বেশি! আর এটাকে পুঁজি করেই আমাদের মুসলমানদের মধ্যে একটা ধান্দা, ব্যবসা, ভিক্ষাবৃত্তি ও চাঁদাবাজি শুরু হয়েছে অনেককাল আগে থেকেই। কিন্তু বর্তমান-যুগে প্রচার ও প্রসারের সুযোগ বেশি থাকায় এই অপতৎপরতা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। আসুন, এবার আমরা দেখি: কীভাবে রমজান-মাসে ইসলামের নামে চাঁদাবাজি, ভিক্ষাবৃত্তি ও বেহেশতো বেচা-কেনার রাজনীতি চলছে।

রমজান-মাসে সবসময় নিজস্বার্থে পরিকল্পিতভাবে চাঁদাবাজি করে থাকে এদেশের মসজিদগুলোর একশ্রেণীর অর্ধশিক্ষিত-অশিক্ষিত ইমাম। এরা সাধারণ মুসলমানদের চোখের সামনে সরাসরি সওয়াবের তথা পরকালের লাভের মূলা ঝুলিয়ে মসজিদ, মাদ্রাসা, হেফজখানা, এতিমখানা ইত্যাদির নামে ব্যাপক ও ভয়াবহ চাঁদাবাজিতে মেতে ওঠে। এদের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ‘মসজিদ-কমিটি’র সমাজবিরোধী দুশ্চরিত্রবান লোকগুলো। এরা সারাজীবন অফিস-আদালতে চাকরিকালীন সময় সুদ-ঘুষের মধ্যে ডুবে থেকে শেষবয়সে এসেছে ইসলামের সেবা করতে! আর এজন্য তারা নাকি মসজিদের খাদেম হয়েছে! এদের যৌবনকালে ইসলামের কথা একবারও মনে হয়নি। তখন এদের একদিনে সমাপ্ত করা ফাইল-আটকিয়ে তা একমাস ঝুলিয়ে সাধারণ মানুষের নিকট থেকে হাজার-হাজার টাকা ঘুষ খেতে সামান্য লজ্জা করেনি। তখন তাদের ইসলামের কথা একটুও মনে হয়নি। আজ এরা ‘মসজিদ-কমিটি’র নামে ভদ্রবেশীভণ্ডশয়তানে পরিণত হয়েছে। আর এদেরই আশ্রয়েপ্রশ্রয়ে এদেশের একশ্রেণীর অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত ইমাম-নামের সন্ত্রাসীগুলো সাধারণ মুসলমানদের বেশি সওয়াব কামাই করার জন্য আজ মসজিদে-মসজিদে চাঁদাবাজি করছে! এরা মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানার সাহায্যের জন্য কতরকম টালবাহানা করে সাধারণ মানুষের পকেট কেটে টাকা বাহির করছে। এরা এখন নিজেদের স্বার্থের চাঁদা-আদায়ের জন্য মানুষকে দোজখের ভয় দেখাচ্ছে আর বেহেশতের লোভ দেখাচ্ছে! এরা আসলে, সমাজ ও রাষ্ট্রবিরোধী চাঁদাবাজ। এরা এখন এতো সওয়াব বোঝে! কিন্তু ১৯৭১ সালে, বাংলাদেশের একটি মসজিদ থেকেও একটি টাকা কোনো মুক্তিযোদ্ধাদের ফান্ডে কিংবা মুক্তিযুদ্ধে যারা নির্যাতিত-শরণার্থী হয়েছিলো—তাদের জন্য মনের ভুলেও দান করেনি। এমনকি ১৯৭১ সালে, বাংলাদেশের একটি মসজিদ থেকেও হানাদার-হায়েনা পাকিস্তানীবেজন্মাদের প্রতিরোধ করার জন্য কোনো ইমাম কোনোদিন আহ্বান করেনি। ১৯৭১ সালের ৯টি মাসে কমপক্ষে ৪০টি জুম্মার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু সেদিন, বাংলাদেশের একটি মসজিদ থেকেও পাকিস্তানীবেজন্মাদের প্রতিরোধ করার জন্য সামান্য একটি আওয়াজও বের হয়নি! বরং এরা, পাকিস্তানীদের প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে-সরাসরি সমর্থন করেছিলো, আর বাংলাদেশের অনেক মসজিদই সেদিন পাকিস্তানী-আর্মিদের ক্যাম্প হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছিলো! আর আজ এরাই, এবং এদেরই বংশধররা এসেছে এদেশের সাধারণ মুসলমানদের সওয়াবের কথা শোনাতে!

মানুষ তার ইচ্ছেমতো দান-খয়রাত করবে। কিন্তু রমজান-মাসে এইসব ভণ্ডইমাম সাধারণ মুসলমানদের আখেরাতপরকাল তথা বেহেশতো-দোজখের ভয় দেখিয়ে তাদের একরকম জিম্মি করে তাদের নিকট থেকে চাঁদা আদায় করছে। এর নাম কি ধর্ম? এদের অত্যাচারে রমজান-মাসে মসজিদে গিয়েও সাধারণ মুসলমানদের শান্তি ও স্বস্তি নাই। তাদের কাছে এই রমজানে প্রতিদিন একটি-দুইটি করে এসি চাওয়া হচ্ছে! আর জুম্মার দিনে মসজিদের ইমামদের এই চাঁদাবাজি আরও বহুগুনে বেড়ে যায়। মসজিদগুলো এখন বিলাসিতার কেন্দ্র। এগুলো এখন কালোটাকার মালিকদের এসি, টাইলস ও দামি মার্বেল-পাথর দিয়ে সাজানো হচ্ছে। আর এর জন্য চলছে জবরদস্তিমূলক চাঁদাবাজি!

এখন এইসব মসজিদের ইমামদের কী বিচিত্র চেহারা! এরা ভিনদেশী রোহিঙ্গাদের জন্য এখনও কেঁদে মরে! তাদের জন্য মসজিদে-মসজিদে সাহায্য-তহবিলগঠন করে! মানুষের বাসা-বাড়ির নতুন-পুরাতন কাপড়চোপড় সংগ্রহ করে (পারলে মানুষের পরনেরটা খুলে নেয় আরকি)! আর ১৯৭১ সালে, এইসব মসজিদের ইমামরা আমাদের মহান মুক্তিযোদ্ধাদের কিংবা পাকবাহিনীর হাতে নিহত নিরীহ বাঙালির জন্য একখানা কাফনের কাপড়ও দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেনি! কতবড় ভণ্ডামি চলছে এই দেশে! সবখানে আজ ভণ্ডের ছড়াছড়ি। আর এখন ইসলামের নামে এরা সর্বত্র নিজেদের স্বার্থের ব্যবসা চালাচ্ছে।
এইসব ভণ্ডইমাম নামক একশ্রেণীর জীব আজকাল মসজিদের সাধারণ মুসল্লীদের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলছে। এরা প্রতি জুম্মায় ও প্রতিদিনের তারাবির নামাজের আগে-পরে বারবার বলছে: রমজান-মাসে বেশি-বেশি দান করুন। এখন দান করলে ২৭গুন বেশি সওয়াব! আর দানের সবচেয়ে উত্তম-খাত বা জায়গা হলো মসজিদ-মাদ্রাসা, লিল্লাহবোর্ডিং, হেফজখানা, এতিমখানা! এদের আর-কিছু মুখে আসে না। সবখানে এদের, নিজেদের স্বার্থ। কারণ, এগুলো সমাজে বেশি-বেশি প্রতিষ্ঠিত হলে এতে এদের কামাই-রোজগারের বিরাট সুযোগসৃষ্টি হবে। মসজিদ-মাদ্রাসা এখন এদের আয়ের খাত। এগুলোকে এরা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান মনে করে না। তাই, রমজান-মাসে এরা ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা কওমীমাদ্রাসায় বেশি-বেশি দানের কথা বলছে। এখানে, আয়-রোজগারের কোনো হিসাবনিকাশ নাই। সবকিছু তাদের হাতে। আর সবকিছু শুধু তাদেরই নিয়ন্ত্রণে। এরা মসজিদ-মাদ্রাসায় দানের নামে নিজেদের পকেট ভারী করছে। আপনাদের হয়তো জানা আছে, এরা কমিশনের ভিত্তিতে আজকাল মসজিদ-মাদ্রাসায় টাকা (চাঁদা) উঠায়। রমজান-মাসে এদের এই অপতৎপরতা আরও বহুগুনে বেড়ে গেছে।

রমজান-মাসে তারাবিহ’র নামাজের জমজমাট ব্যবসা শুরু হয়ে যায়। প্রিয় মুসলমান ভাইয়েরা মনে রাখবেন: আমাদের রাসুল সা.-এর যুগে কোনো আনুষ্ঠানিক ‘তারাবিহ’ কিংবা ‘খতমে তারাবিহ’ নামাজ অনুষ্ঠিত হয়নি—এগুলো পড়া হয়নি। হঠাৎ এগুলো সৃষ্টি হলো কীভাবে? এব্যাপারে অনেকে দলিল দাখিল করে যে, কথিত খলিফাহ উমরের আমল থেকে এগুলোর প্রচলন হয়েছে! কিন্তু উমর তো কোনো নবী-রাসুল নয়। তার তো ইসলামের ভিতরে কোনোকিছু নতুনভাবে সংযোজন করার কোনো অধিকার বা এখতিয়ার নাই। এগুলো সম্পূর্ণ বিদআত। এগুলো বা আনুষ্ঠানিকভাবে তারাবিহ’র নামাজ পড়া বা খতমে তারাবিহ’র নামাজ মুসলমানদের জন্য পালন করা ফরজ, ওয়াজিব কিংবা সুন্নত নয়। কিন্তু বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্র এখন ইসলামের নামে চলছে ‘খতমে তারাবিহ’। তার কারণ, মসজিদে এই নামাজআদায়ের ব্যবস্থা করলে তথাকথিত ‘হাফেজ’ তথা ‘মসজিদের ইমাম’দের অধিক টাকা কামাইয়ের বিরাট একটা সুযোগসৃষ্টি হয়। এখানে, ‘খতমে তারাবিহ’তে নামাজ মুখ্য নয়—মুখ্য বিষয় হলো—এর নামে রমজান-মাসে বিরাট অঙ্কের টাকা কামাই-রোজগার করা। মুসলমানগণ রমজান-মাসে তার সামর্থ্য অনুযায়ী ‘তারাবিহ’র নামাজ আদায় করবে। এখানে, ধরাবাঁধা কোনো বিধিবিধান নাই। উল্লেখ্য যে, আমাদের নবী করীম সা. রমজান-মাসে একাকি তারাবিহ’র নামাজআদায় করতেন। তিনি কখনও ৮-রাকায়াত, ১২-রাকায়াত ও ২০-রাকায়াত নামাজআদায় করতেন, আর তিনি এটি নিয়মিত আদায় করেননি, যাতে এটি সাধারণ মুসলমানদের ওপর ফরজ হয়ে না যায়। এটিকে নফল হিসাবে রাখতেই তিনি এমনটি করেছেন।

মসজিদগুলোতে ২০-রোজার পর থেকেই মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন ও সমাজবিরোধী মসজিদ-কমিটির সদস্যরা তারাবিহ’র নামাজের জন্য জোরপূর্বক চাঁদা বা বখশিস আদায় করতে থাকে। আর মানুষজন স্বতঃস্ফূর্তভাবে বা খুশিমনে টাকাপয়সা দিতে না চাইলে মসজিদের ইমামরা এইসময় সাধারণ মুসল্লীদের আখেরাতপরকালের বিরাট ভয় দেখায়। একপর্যায়ে তারা একমাস ‘খতমে তারাবিহ’র জন্য সরাসরি ভিক্ষা করতে শুরু করে দেয়। খতমে তারাবিহ-নামাজপড়ানোর জন্য সরাসরি ভিক্ষা চাইতে গিয়ে এইসময় ‘মসজিদ-কমিটি’র রাষ্ট্রবিরোধী-লোকগুলো সাধারণ মুসল্লী তথা মুসলমানদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতে শুরু করে দেয়। তাদের কথা হলো—নামাজ পড়েছেন, এখন টাকা দিবেন না কেন? গতবছর এক-মুসল্লী বললেন, “আমি আপনাদের তারাবিহ পড়ি নাই। মসজিদে এশার নামাজ পড়ে বাসায় চলে গিয়েছি।” তবুও মসজিদ-কমিটি তাকে ছাড়ে নাই। বলেছে, তবুও আপনাকে কিছু দিতে হবে। এটা শুধু চাঁদা নয়। এটা সম্পূর্ণ ভিক্ষাবৃত্তি। আজ নিজেদের স্বার্থে মসজিদের সস্তা-ইমামরা ইসলামের নামে চাঁদাবাজি ও ভিক্ষাবৃত্তি পর্যন্ত করছে! এখানে, নামাজ কোথায়? আর ‘খতমে তারাবিহ’তে নিজস্বার্থের কুরআন-খতমের নামে কুরআনেরই-বা পবিত্রতা কোথায়? এতো শুধু ইসলামের নাম-ভাঙ্গিয়ে কুরআন বেচে খাওয়ার আয়োজন ও জোগারযত্ন। আমাদের দেশের অধিকাংশ মসজিদের সস্তা-ইমামরা এখন ইসলামের নামে এই অপকর্মটিই করছে।

রমজান-মাসে সবকিছুতে ২৭গুন সওয়াব। মসজিদের অর্ধশিক্ষিত-ইমামরা আজ শুধু এই হাদিসখানা মানে। এরা দেশের মসজিদগুলোতে এইসব কথা প্রচার করে সাধারণ মুসলমানদের বেহেশতের লোভ দেখাচ্ছে! এরা বলছে, “আজকে যদি আপনি মসজিদের জন্য একটি টাকাও দান করেন—কাল কিয়ামতে আল্লাহ আপনাকে ২৭টি টাকার সওয়াব দিবেন! আর আজ যদি আপনি কষ্ট করে হলেও একলক্ষ টাকা দান করেন—তাহলে, পরকালে মহান আল্লাহ খুশি হয়ে আপনাকে ২৭লক্ষ টাকার সওয়াব দিবেন! আপনারা, রমজান-মাসে বেশি-বেশি রোজাদারদের ইফতার করান—আলেম-উলামার খেদমত করেন। তাহলে, পরকালে এর ২৭গুন সওয়াব পাবেন। চিন্তা করে দ্যাখেন—মাত্র একটি খেজুর দিয়ে কাউকে ইফতার করালে আপনি তাকে ২৭টি খেজুর খাওয়ানোর সওয়াব পাবেন! আর এই সওয়াবের কারণে আখেরাতে মহান আল্লাহ আপনার জন্য আটটি বেহেশতের দরজা সরাসরি খুলে দিবেন!” এইসব আশার বাণী শ্রবণ করে দেশের সর্বস্তরের ঘুষখোর, সুদখোর, ভূমিদস্যু ও কালোটাকার মালিকরা এখন দানের কাজে ব্যস্ত! এরা রমজান-মাসে লক্ষ-লক্ষ টাকার ইফতারপার্টি করছে, জাকাত দিচ্ছে, মসজিদ-মাদ্রাসায় দু’হাতে ঢেলে দিচ্ছে! এরা হারাম-টাকায় ইফতারপার্টি দিচ্ছে মহল্লায়-মহল্লায়, মসজিদে-মসজিদে! আর একশ্রেণীর সাধারণ মুসলমান এই কালোটাকার মালিকদের ইফতারসামগ্রী গোগ্রাসে গিলছে! আজ বাংলাদেশের একদল কালোটাকার মালিক নামক অমানুষ সুদ-ঘুষের টাকায় মসজিদের ইমামের নেতৃত্বে আটটি বেহেশতো কিনে নিচ্ছে! আর মহান আল্লাহর বেহেশতো অতিসস্তায় বিক্রি করছে মসজিদের এইসব সস্তা-ইমাম। এদের হাবভাব দেখে মনে হয়: এরা যেন মহান আল্লাহর নিকট থেকে এভাবে ও এতো সস্তায় বেহেশতো বিক্রির অনুমতি পেয়েছে! আর এরা সেভাবেই নিজেদের মুসল্লীদের সামনে উপস্থাপন করছে। এরা যেন বেহেশতো-বিক্রির এজেন্ট! অথচ, এদের কাউকেই কেউই এভাবে বেহেশতো বিক্রি করার কথা বলেননি।
বাংলাদেশের মসজিদের একশ্রেণীর ইমাম রমজান-মাসে রোজার পবিত্রতা বিসর্জন দিয়ে মহান আল্লাহর আদেশ-নিষেধ ভুলে দেশের একশ্রেণীর কালোটাকার মালিক নামক নরপশুদের কাছে বেহেশতো বিক্রয় করছে! কে এদের এসব করার বা এভাবে বেহেশতো বিক্রয় করার পারমিশন দিয়েছেন? জানি, কোনো জবাব নাই এদের কাছে। এই নরপশুরাই ১৯৭১ সালে, শুধু নিজেদের স্বার্থে পাকিস্তানের নামে এভাবে দিন-রাত বেহেশতো বিক্রয় করতো, এবং যে-কেউ পাকিস্তানের পক্ষে যোগদান করলে তাকে বেহেশতো দিয়ে দিতো! আর আমাদের দেশপ্রেমিক মহান মুক্তিযোদ্ধাদের নামে এরা সবসময় আজেবাজে ফতোয়া প্রদান করতো। এরা যে কতটা অবিবেচক আর মূর্খ—তা এরা এখনও জানে না, আর তখনও জানতো না। বস্তুতঃ পৃথিবীতে এদের মতো স্বার্থপর কোনো প্রাণি নাই।

একজন সৎ সরকারি-কর্মকর্তা বা উচ্চপদস্থ বেসরকারি-কর্মকর্তা যদি তার স্ত্রী, পুত্র ও কন্যাদের নিয়ে এই ঢাকা-শহরে সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন জীবনযাপন করতে চান—তাহলে, তিনি বাসা ভাড়া থেকে শুরু করে সামাজিক সকল দায়িত্ব-কর্তব্য-পালন করে মাসে কয়টি টাকা বাঁচাতে পারবেন? আমার তো মনে হয় না, আমাদের জীবনযাত্রার মানে তার পক্ষে হাতখরচের সামান্য কয়টি টাকা ব্যতীত আরকিছুই জমানো সম্ভব নয়। তিনি মসজিদ-মাদ্রাসায় হাজার-হাজার বা লক্ষ-লক্ষ টাকা দান করবেন কীভাবে? তিনি রমজান-মাসে মসজিদে একটি বা দুইটি ‘এসি’ দান করবেন কোত্থেকে? আর যারা সরকারি-চাকরি করে এসব দান করছে—তারা কারা? আর এদেরই কাছে মসজিদের ইমামরা আজ বেহেশতো বিক্রয় করছে! মসজিদের এইসব চাপাবাজ-ইমাম দানের নামে আজ মুসল্লীদের অসৎ করে তুলছে। এরা (কালোটাকার মালিক থেকে শুরু করে আজ সর্বস্তরের সাধারণ মুমীন-মুসল্লীরাও) মনে করছে: যেন-তেন-প্রকারেণ টাকা রোজগার করে তা মসজিদ-মাদ্রাসায় দান করলে আর-কোনো সমস্যা নাই। আজ মসজিদের ইমামরা দান পেলেই খুশি। আর এইসব দাতাদের এরা সরাসরি বেহেশতো দিয়ে দিচ্ছে! এদের ধৃষ্টতা দেখুন!

মসজিদ-মাদ্রাসাগুলোতে রমজান-মাস নিয়ে আজকাল ভয়াবহ অপরাজনীতি চলছে। ধর্মব্যবসায়ীগোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে রমজান-মাসে ব্যাপকভাবে চাঁদাবাজি শুরু করে দিয়েছে। তারা আমাদের একসময়কার সাধারণ বা কুরআনের সুরাভিত্তিক ‘সুরা-তারাবিহ’ বাদ দিয়ে নিজেদের পকেট ভারী করতে এখন শুধু ‘খতমে তারাবিহ’র রেওয়াজ চালু করেছে। আপনারাই বলুন, এদের হাতে ইসলাম নিরাপদ নাকি ঝুঁকিপূর্ণ? আজ জাতির চরম দুর্ভাগ্য যে, এই অমানুষগুলোই আমাদের নামাজের ইমাম!

মসজিদগুলোকে আজ ভালোমানুষের সত্যিকারের ইবাদতখানায় পরিণত করতে হবে। আর মসজিদ-মাদ্রাসার নামে সাধারণ মুসলমানদের বেহেশতো-দোজখের লোভ বা ভয় দেখিয়ে, তাদের জিম্মি করে ইসলামের নামে এইসব চাঁদাবাজি, ভিক্ষাবৃত্তি ও অপরাজনীতি বন্ধ করতে হবে। এই বিষয়ে দেশের সরকারকে উদাসীন না থেকে এখনই সজাগ ও সতর্ক হতে হবে।

সাইয়িদ রফিকুল হক
২৪/০৫/২০১৮

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

সাইয়িদ রফিকুল হক
সাইয়িদ রফিকুল হক এর ছবি
Offline
Last seen: 1 দিন 21 ঘন্টা ago
Joined: রবিবার, জানুয়ারী 3, 2016 - 7:20পূর্বাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

কপিরাইট © ইস্টিশন ব্লগ ® ২০১৮ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর