নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 2 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • আলমগীর কবির
  • মিঠুন বিশ্বাস

নতুন যাত্রী

  • চয়ন অর্কিড
  • ফজলে রাব্বী খান
  • হূমায়ুন কবির
  • রকিব খান
  • সজল আল সানভী
  • শহীদ আহমেদ
  • মো ইকরামুজ্জামান
  • মিজান
  • সঞ্জয় চক্রবর্তী
  • ডাঃ নেইল আকাশ

আপনি এখানে

নেফারপ্রীতি পর্ব-৭ : মৃত মুক্তামনির কবরে নেফারপ্রীতি


পৌরুষময় প্রেমভরা যৌবনময়ী নদীবক্ষা নারীর মত নেফারপ্রীতি উড়তে থাকে আমাকে নিয়ে পদ্মা ছাড়িয়ে একদম মেঘনার উপর দিয়ে আমার দ্বীপগাঁয়ের দিকে! আকস্মিক কি যেন মনে হয় আমার! মনটা খুব খারাপ হয় সাতক্ষীরার শিশু মুক্তামনির কথা মনে পড়াতে! গতকাল মারা গেছে ১২-বছরের এ কিশোরি মেয়েটি। অনেকবার টিভিতে দেখেছিলাম তার রোগাক্রান্ত হাতটি! আর তার কষ্টক্লিষ্ট ব্যথাতুর দুখমুখ! নেফারপ্রীতিকে বললাম, চলো আমার গ্রামের বাড়িতে নয়, সাতক্ষীরা যাই, যেখানে ঘুমিয়ে রয়েছে মৃত এক শিশু নাম মুক্তামনি! নেফারপ্রীতি বললো, যাচ্ছি তবে সেদিকেই! এই ফাঁকে তুমি কি আমাকে বলবে, তার পরিচয় আর তার মৃত্যুকাহিনি!
:
আমাদের বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমের সাতক্ষীরার সদর উপজেলার কামারবায়সা গ্রামের মুদি দোকানি ইব্রাহীম হোসেনের কন্যা ছিল মুক্তামনি। জন্মের দেড় বছর পর শিশু মুক্তামনির দেহে একটি ছোট মার্বেলের মতো ফোঁড়া দেখা দেয়। এরপর থেকে সেটি বাড়তে থাকে ক্রমাগত। বাংলাদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়েও তার তেমন কোনো সুচিকিৎসা হয়নি। তার আক্রান্ত ডানহাত ক্রমে ছোট আকারের গাছের গুড়ির রূপ নিয়ে প্রচণ্ড ভারী হয়ে উঠছিল। ক্রমে এতে পঁচনও ধরেছিল মারাত্মক। পোকাও জন্মেছিল হাতের ঘায়ে। দিনরাত চুলকানি ও যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে থাকতো মুক্তামনি। আক্রান্ত স্থান থেকে বিকট গন্ধও ছুটতো দিনরাত! এরপর তাকে ঢাকা মেডিকেলে আনা হয়। আমাদের জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের একদল চিকিৎসক তার টেস্টের রিপোর্ট পাঠান সিঙ্গাপুরে। সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসকরা, ছোট্ট মুক্তামনির রোগ বিরল চর্মরোগ আরোগ্যযোগ্য ও অস্ত্রোপচারের যোগ্য নয় বলে মতামত দেন!
:
তারপরো ঢামেকের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের একদল চিকিৎসক মুক্তামনির স্কিন গ্রাফটিং অপারেশনে অংশ নেন সাহসি মানুষ হয়ে। পরে মুক্তামনির হাত আবার ফুলে যাওয়ায়, ফোলা কমানোর উদ্দেশ্যে হাতে প্রেসার ব্যান্ডেজ বেঁধে দেয়া হয়। মুক্তামনি ঢামেক হাসপাতালে ছয় মাস চিকিৎসা নিয়ে ২০১৭ সালের ২২ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় তাদের নিজ বাড়িতে পৌঁছায় মাবাবার সাথে। বাংলাদেশের ডাক্তারদের সর্বাত্মক আন্তরিকতার পরও, ক্রমে এ রোগ তার দেহের সর্বত্র ছড়িয়ে যায়, যে কারণে তাদের বাড়িতে আত্মীয় স্বজন ও পড়শিদের যাতায়াতও এক রকম বন্ধ হয়ে যায় ঘৃণায় কিংবা আতঙ্কে! অনেক কষ্টভাগোর পর গতকাল সকাল ৮-টায় নিজ বাড়িতে মা-বাবার সামনেই সবাইকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে যায় চর্মরোগ কিংবা জটিল রক্তনালীর টিউমারে আক্রান্ত দরিদ্র দুখিমেয়ে মুক্তামনি!
:
এসব শুনে আকস্মিক নেফারপ্রীতি টলমলে জলের মত স্বচ্ছ স্বর্ণাভ মেঘরাজ্যে স্থির ছায়ার মত দাঁড়ায় এবার! চোখ তুলে বলে, চলো তবে সেখানেই যাই! মেঘবাতাসে উড়ে উড়ে কষ্টদহনে এগুতে থাকি আমরা মুক্তামনির বাড়ির দিকে! সূর্য ডোবা পর্যন্ত অপেক্ষা করি আমরা আকাশরাজ্য! যেন প্রাকসন্ধ্যায় যখন সবাই ব্যস্ত থাকবে নিজ-নিজ কাজ নিয়ে, এফাঁকে আমরা সবার অগোচরে দেখতে পারি মুক্তামনিকে! ইফতারির সময় হলে, ঠিক তখনই আমরা নামি একদম মৃত মেয়েটির তাজা কবরের কাছে। একটা কুমড়ো লতার পাশে সবুজ খেজুরের ডাল তখনো পোতা তাজা কবরটির উপর। একটু দূরেই তার বাবা ইব্রাহিমের নাড়ার পালা। নেফারপ্রীতিকে বললাম, তুমি কি ভেতরে ঢুকে দেখে আসতে পারবে মেয়েটিকে? কি অবস্থা এখন তার?
:
অদৃশ্য হলো নেফারপ্রীতি। কবরের ভেতরে চলে গেছে সে। আমি দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকাতে থাকি। না এ বাগানে ওদের ঘরের বেশ দূরে সন্ধ্যার অন্ধকারে কেউ নেই আশেপাশে। রিণরিণকে একটা ক্রন্দসি সুরে শুনতে পাই আমার কানে দূর থেকে। সম্ভবত মা আসমা খাতুন কাঁদছে তার মৃত মেয়ের জন্যে। আর কোথাও কোন শব্দ নেই। একটু পর উঠে এলো নেফারপ্রীতি। বললো, হ্যা দেখে এলাম তাকে। মুখটা খুব মায়াবি। আমাদের মত-তো মমি করা হয়নি তার দেহ। তাহলে তার শরীর তো ধ্বংস যাবে তাইনা? ধ্বংস হওয়া শরীর স্বর্গে যাওয়া জটিল।
আমি বললাম, মুক্তামনি বাংলাদেশি মুসলিম মেয়ে! তোমাদের মিসরিয় ফারাও আমলের মেয়ে নয় যে, তোমাদের স্বর্গে যেতে হবে। সে অল্পবয়েসি নিষ্পাপ মেয়ে। বাংলাদেশের সব মানুষের ভালবাসা আর দোয়া নিয়ে অনেক কষ্ট আর যন্ত্রণায় মৃত্যুবরণ করেছে সে। একজন নিষ্পাপ কমবয়েসি মেয়ে হিসেবে মৃত্যুর পর তার ইসলামি জান্নাতে যাওয়া উচিত। এটাই ইসলামি রীতি!
:
নেফারপ্রীতি তাকিয়ে রইলো আমার দিকে। আমি বললাম, তুমি কি তার সাথে কোন কথা বলতে পারবে? নেফারপ্রীতি বললো, হ্যা মৃত মানুষের রুহ বা আত্মাদের সাথে কথা বলতে পারি আমি দেবকন্যা হিসেবে। আমি কি বলবো তার সাথে কোন কথা? হ্যাঁ সূচক জবাব দিয়ে বললাম, তুমি কি আমাকে নিয়ে যেতে পারবে তোমার সাথে তার কাছে? যাতে আমি দেখতে পারি কি বলছো বা কি করছো তুমি? সে বললো, তুমি জীবিত বলে মৃতদের জগতে গেলে আর ফিরে আসতে পারবে না তুমি। কারণ তুমি সাধারণ মানুষ ফারাওপুরুষ নও! বরং আমি গিয়ে তার সাথে কথা বলে আসি!
:
আমার ভয়ার্ত দীর্ঘতর অপেক্ষার সময় আর শেষ হয়না যেন! কামারবায়সা গ্রামের দূরের মসজিদ থেকে আজানের শব্দ শুনি আমি কানে। দূর থেকে জোনাকির ঝাঁক এদিকে আসছে হয়তো আমার দিকে কিংবা মুক্তামনির কবরকে আলোকিত করতে! এর মধ্যে নেফারপ্রীতি এসে দাঁড়ায় আমার সামনে। বলে, হ্যাঁ কথা বলেছি আমি মেয়েটির সাথে। সে এখন খুব ভাল আছে। এখন আর কোন যন্ত্রণা নেই তার। অনেকদিন থেকে খুব কষ্ট পাচ্ছিল সে। রাতে নাকি ঘুমুতে পারতো না একটুও, খেতে পারতো না কিছু। তার পচাগলা হাতটিতেও কোন ব্যথা নেই এখন আর। এক প্রশান্তির মধ্যে ঘুমিয়ে আছে সে। তার কবরটিতে এক রকম ফুলেল মধুরিম গন্ধ পেয়েছি আমি আমার নাকে, যা সাধারণত অমর দেবতাদের পিরামিড অভ্যন্তরে পাওয়া যেত সারাক্ষণ! মেয়েটি পূণ্যবতি নিশ্চয়ই! সাড়ে তিন হাজার বছর আগে আমার সময়ে হলে, পিতা "আতেন"কে বলে ওকে জীবিত কিংবা পুনর্জন্ম করাতাম আমি! কেন যে এতো কমবয়েসি নিষ্পাপ শিশুরা মারা যায়, তা আজও বুঝিনি আমি!
:
কথা বলতে বলতে চোখে নীলাভ জল নামে নেফারপ্রীতির! ওর ধূসর চোখগুলো লাল হয়! যেন কিছু রক্তলাল কৃষ্ণচূড়া আর অভিমান গুচ্ছরা একাকার করে মিসরিয় এ মানবিক মেয়েটির। আমি মৃত মুক্তামনির মুখটা দেখি নেফারপ্রীতির অবয়বে বারবার! নিজের বুকের ব্যথাচক্র দমাতে সপ্তবর্ণা আকাশের দিকে তাকাই একাকি আমি! যেখানে আলোর কবিরা ক্রমাগত পাঠ করে যায়, মানুষের জীবনমৃত্যুর কবিতাগুচ্ছ! চোখ মুছে নেফারপ্রীতি বলে, কান্না কিসের! চল দেখে আসি কে কাঁদছে ওখানে! ছোট ভাঙা ঘরের পেছনে দাঁড়াই চুপিসারে আমি আর নেফারপ্রীতি! মৃত মেয়ের শোকে শোকাকুল মা আছমা বেগম এখনো কাঁদছে এক ঘুণেধরা বাঁশখুটিতে হেলান দিয়ে! এ শুচি নারীর মৃত মেয়ের রুগ্নতার কাঁধে হাত রেখে একরাশ সান্ত্বনা বাতাস ঘরের মধ্যে ঠেলে দেয় নেফারপ্রীতি। মায়ামোহিনি এ শক্তিধর স্বর্গঅপ্সরির দুখবিনাশী বাতাসে উড়য়ে দেয় মা আছমা বেগমের মাটিতে লুটানো আঁচল! ক্রমে দুখগুলো ধুয়ে যেতে থাকে তার আষাঢ়ি ঝুম বৃষ্টির মত! ঘরের চারদিকে তাকায় দুখনারী তার মেয়ের উপস্থিতি টের পেতে এবার! অত্যন্ত সঙ্গোপনে দুজনে পেঙ্গুইন পায়ে হেঁটে চলি আমরা তুষারের গহিন পিচ্ছিল পথে যেন। উড়াল দেয় এবার নেফারপ্রীতি আমায় নিয়ে পিচ্ছিল উঠোন নিচে রেখে, যেখানে হাঁটতো মুক্তামনি কৈশোরে তা ছোট্ট পা-ফেলে! আমরা উড়ে চলি অন্ধকার কেটে কেটে অনেক দূর! তারাভরা নাক্ষত্রিক আকাশটা জেগে থাকে আমাদের সাথে! যে আকাশে গৈরিক নীলাভ ক্ষীয়মান তারা হয়ে জ্বলতে থাকে, বারো বছরের কিশোরি মুক্তামনি!

(এরপর পর্ব-৮ আগামিকাল)

Comments

ড. লজিক্যাল বাঙালি এর ছবি
 

!

===============================================================
জানার ইচ্ছে নিজেকে, সমাজ, দেশ, পৃথিবি, মহাবিশ্ব, ধর্ম আর মানুষকে! এর জন্য অনন্তর চেষ্টা!!

 
ড. লজিক্যাল বাঙালি এর ছবি
 

!

===============================================================
জানার ইচ্ছে নিজেকে, সমাজ, দেশ, পৃথিবি, মহাবিশ্ব, ধর্ম আর মানুষকে! এর জন্য অনন্তর চেষ্টা!!

 
ড. লজিক্যাল বাঙালি এর ছবি
 

!

===============================================================
জানার ইচ্ছে নিজেকে, সমাজ, দেশ, পৃথিবি, মহাবিশ্ব, ধর্ম আর মানুষকে! এর জন্য অনন্তর চেষ্টা!!

 

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

ড. লজিক্যাল বাঙালি
ড. লজিক্যাল বাঙালি এর ছবি
Offline
Last seen: 1 week 2 ঘন্টা ago
Joined: সোমবার, ডিসেম্বর 30, 2013 - 1:53অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

কপিরাইট © ইস্টিশন ব্লগ ® ২০১৮ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর