নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 0 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

নতুন যাত্রী

  • সুশান্ত কুমার
  • আলমামুন শাওন
  • সমুদ্র শাঁচি
  • অরুপ কুমার দেবনাথ
  • তাপস ভৌমিক
  • ইউসুফ শেখ
  • আনোয়ার আলী
  • সৌগত চর্বাক
  • সৌগত চার্বাক
  • মোঃ আব্দুল বারিক

আপনি এখানে

বাঙালি সংস্কৃতি, নববর্ষ ও পান্তা ইলিশ প্রসঙ্গ



আমরা বাঙালি সংস্কৃতির ধ্বংসের কথা বলতে গিয়ে এক "আবহমান বাঙালি সংস্কৃতির" কাল্পনিক রূপকল্প হাজির করি। সেই রূপকল্পে সংস্কৃতিকে আমরা ধরে নিয়েছি একটি জলঅচল কুঠুরির মতো। অর্থাৎ বাঙালি সংস্কৃতি স্থির, অবিমিশ্র এবং অবিনশ্বর - এমনটাই শেখানো হয় আমাদেরকে। অথচ সত্যটা হচ্ছে যে সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র‌্য ও সাংস্কৃতিক বিশুদ্ধতা বলে কিছু নেই। জাত্যাভিমানের মতোই সাংস্কৃতিক আত্মাভিমান সমান ক্ষতিকর হতে পারে। অবিমিশ্র বাঙালি সংস্কৃতির ধারণা অবাস্তব। আহবহমান বাঙালি সংস্কৃতি বলেও কিছু নেই, থাকতেও পারেনা। কোন কিছু যদি আবহমান কাল ধরে চলতে থাকে তাহলে সেটা ঐতিহ্য বা প্রথা মাত্র। এগুলো সংস্কৃতি নয়, সংস্কৃতির ক্ষুদ্র উপাদান।

সংস্কৃতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ভাষা। বাংলা ভাষার শব্দসম্ভারের ৪৮% শব্দ বিদেশী। এই হিসাব সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় মহোদয়ের। এই আটচল্লিশ শতাংশ বিদেশী শব্দ বাংলায় এসেছে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের মাধ্যমে। কোচবিহারের রাজা কর্তৃক আসামের রাজাকে লেখা যে চিঠিটাকে বাংলা গদ্যের প্রাথমিক নিদর্শন হিশেবে ধরা হয় তার অধিকাংশ শব্দই সংস্কৃত, আর আছে কিছু আরবি ফারসি। বাংলা গদ্যের বিকাশ পর্বে (ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ পর্ব)যারা ভূমিকা রেখেছেন তাঁদের বেশিরভাগই অভিজাত শ্রেণীর লোক হওয়ায় তাঁরা যে বাংলা গদ্য সৃষ্টি করেছেন সেখানে একধরনের সংস্কৃত আভিজাত্যবোধ থেকে বাংলা গদ্যে প্রচুর সংস্কৃত শব্দ ঢুকিয়েছেন। ব্রিটিশরা এক সময় রাজভাষা ফার্সি বদলিয়ে ইংরেজিকে রাজভাষা করল। বাঙালিরা তখন ইংরেজি ভাষাটাও শিখতে শুরু করল। এভাবে বাংলা শব্দ ভাণ্ডারে স্বাভাবিকভাবেই অনেক ইংরেজি শব্দ স্থান করে নিলো।কাজী নজরুল ইসলাম এবং মোহিতলাল মজুমদার বাংলা কবিতায় স্বার্থকভাবে আরবি ফারসি শব্দেরও প্রয়োগ করেছেন।দেখা যাচ্ছে যে বাংলা ভাষার শরীর জুড়ে অসংখ্য ভীনদেশী ভাষার গ্রহণ ও আত্মীকরণের চিহ্ন। কথাগুলো বললাম এটা বোঝানোর জন্য যে সংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদান যেমন ভাষায় পরিবর্তন আসে। প্রতিনিয়ত গ্রহণ বর্জনের দ্বারা রূপান্তরিত হয়।

এই যে সকল ভাষা এসে মিশেছে আমাদের ভাষার সাথে, সেইসব ভাষা কী একা একাই পায়ে হেটে বা বাতাসে ভেসে এসেছে আমাদের দেশে?ভাষা যখন এসেছে তখন নিশ্চয়ই ওই ভাষাভাষী মানুষের সাথে এ অঞ্চলের মানুষের কোন না কোন দিক দিয়ে একটা যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছিলো।মানুষের সাথে মানুষের যোগাযোগের ফলে সাংস্কৃতিক উপাদানের স্থানান্তর বা আদানপ্রদান এবং রূপান্তর হয়। অর্থাৎ ভাষা একা আসেনা, সে সাথে করে নিয়ে আসে ওই ভাষার মানুষের সংস্কৃতি।

এইখানে আমরা একটু বাঙালির নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ের সন্ধান করে নিই।তারপর আবার বাঙালির সংস্কৃতি প্রসঙ্গে ফিরছি। আজকের বাংলাদেশ চিরকাল এই নামে ছিল না। আর্যমঞ্জুশ্রীকল্প অনুযায়ী ইতিহাসে একদা বাঙালির স্বদেশভূমি ছিল বঙ্গ, সমতট, হরিকেল, গৌড় ও পুণ্ড্র জুড়ে বিস্তৃত। সমগ্র বঙ্গের মানুষদের পূর্বসূরীরা ছিলেন অসুরভাষী। অর্থাৎ বাংলা বৈদিক সংস্কৃতির অনুগামী ছিল না, এবং আমাদের ভাষা বৈদিক সংস্কৃতের থেকে ছিল আলাদা।চারটি নরগোষ্ঠী বা রেসের সংমিশ্রণে উদ্ভূত এই বাঙালি জাতি। সেগুলো হল অস্ট্রিক (অস্ট্রিকভাষী),মেলানিড (দ্রাবিড়ভাষী),পূর্ব–ব্র্যাকিড/অ্যালপাইন(অবৈদিক আর্যভাষী) এবং মোঙ্গলয়েড (টিবেটো–বার্মিজভাষী)। ঠিক কবে এরা এ অঞ্চলে এসেছে সেই হিসাব এখনো অনির্ণীত। কিন্তু বঙ্গ, গৌড়,পুণ্ড্র,রাঢ় –এই জনজাতিগুলির উত্থান ঐতিহাসিককালেই ঘটেছে, এবং এদের সংমিশ্রণে আজকের বাঙালি জাতির গঠনের প্রক্রিয়াটি বেশিদিন পুরোনো নয়। এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল হাজার আড়াই বছর আগে থেকে,এবং এই সংমিশ্রণ সম্পূর্ণতা পেয়েছে শশাঙ্কযুগে, তারপরে পাল ও সেন আমলে।

বাঙালির এই প্যাটার্ন যতদিনে সম্পূর্ণতা পেয়েছে ততদিনে বাঙালির স্বদেশে হানা দিতে শুরু করেছে তুর্কী, পাঠান, মোগলেরা। দীর্ঘ ইতিহাস পরিক্রমায় এখানে এসেছে পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, ফরাসী আর ইংরেজরা। বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতিতে এদেরও প্রভাব পড়েছে স্বাভাবিকভাবেই। কিন্তু পাল আমল শেষে বাঙালি হয়ে গেছে পরাধীন বিদেশী শাসকদের প্রভূত্ব কখনো স্বীকার করে,কখনোবা বিদ্রোহ করে কেটে গেছে বহুকাল। এরপর ভারত উপমহাদেশের পূর্বপ্রান্তে আধুনিককালে বাঙালি অধ্যুষিত একটা অঞ্চলের পরিচিতি হয়েছে পূর্ব বঙ্গ নামে। অতপর পূর্ব পাকিস্তান, তৎপর পূর্ব বাংলা। অবশেষে বাংলাদেশ নামে থিতু হয়েছে।

দেখতে পাচ্ছি যে আমরা যারা বাঙালি বলে নিজেদের পরিচয় নির্ধারণ করেছি সেই বাঙালির রক্তের মধ্যেই কত রকমের মানুষের বসবাস। বাঙালির মধ্যে আছে তার অনেক রকমের পূর্বপুরুষের মিশ্রণ। অবিমিশ্র বাঙালি শরীরই যখন অলীক বস্তুু, তখন অবিমিশ্র বাঙালি সংস্কৃতি কিভাবে সম্ভব? সম্ভব নয়। আবহমান বাঙালি সংস্কৃতি বলে কিছু আদৌ থাকতে পারে না।"সংস্কৃতির আবহমানতা" ধারণাটা স্বয়ং সংস্কৃতি ধারণার সাথে বিরোধপূর্ণ। সংস্কৃতি ব্যাপারটা প্রবহমান এবং প্রবহমানতার পথে গ্রহণ বর্জন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায়। সুতরাং সংস্কৃতির কোন শাশ্বত এবং স্থির রূপ থাকতে পারেনা। সংস্কৃতি জিনিসটা কোন ঐশী গ্রন্থের মন্ত্র তন্ত্র নয় যে চিরকাল অপরিবর্তনীয় থাকবে।

নববর্ষ উদযাপনের যে চিত্র "আবহমান" বিশেষণ দিয়ে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে সেটা উনিশ এবং বিশ শতকের গ্রামীন বাংলার চিত্র। বাংলাদেশ, তার সভ্যতা, সংস্কৃতি, তার অর্থনৈতিক বিন্যাস সর্বোপরি বাঙ্গালির জীবনধারা তো আর চিরকাল উনিশ শতকে আটকে থাকবে না। নতুন সময়ে নতুন উপাদান সংস্কৃতিতে যোগ হয়েছে। পান্তা ইলিশ তেমনি একটি নতুন সংযোজন। অনেকে বলবেন এই পান্তা ইলিশের সাথে আমাদের প্রাণের যোগ নেই।আমি বুঝিনা যোগ নেই কোথায় ? ইলিশ মাছ তো আমাকে নববর্ষ উদযাপনের জন্য বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে না। দাম বেশি হলেও সারা দেশেই পাওয়া যায়,পান্তাও ঘরের খাবার। বরং ইলিশ বিশেষত বাঙালির সম্পদ, বাঙ্গালি মাছ। অনেক উৎসব উদযাপনের জন্যই আমরা দেখি বিদেশ থেকে নানা ধরনের খাবার আমদামি করতে হয়। তখন তো নাড়ির যোগের কথা ওঠে না । ধর্মনিরপেক্ষ এই অসাধারন একটা দিন হাসি আনন্দে আর নানা আয়োজনে উদযাপনের বেলায় আপনাদের এত পোড়ে কেন ?

সারা বছর বিবিধ রকমের যন্ত্রণাই তো ভোগ করি আমরা। একটা দিন যদি এই উৎসব উপলক্ষে নাগরিক যন্ত্রণা ভুলে, কাজের ক্লান্তি একঘেয়েমিকে ছুটি দিয়ে পুরনো বন্ধুর সাথে দেখা-কথা বলি, বউ বাচ্চা মিলে রাস্তায় রাস্তায় উৎসবমুখর জনতার বর্নিল মিছিলে সামিল হই সমস্যা কী? কেউ যদি তার সাধ্যের উপরে উঠে বাজার থেকে ছোট্ট একটা ইলিশ কিনে পরিবার ও বন্ধুবান্ধব সাথে নিয়ে খায় তাহলে কি বাঙ্গালি সংস্কৃতির অন্তসলিলা প্রাণটা আরো প্রাণবান হয়না, সংস্কৃতির সজীবতা আরো খানিকটা সবুজ ও সতেজ হয় না?আর যারা বলেন পহেলা বৈশাখ "হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি", তাদেরকে কিছু বলার নাই। দুনিয়ার নিরানববই ভাগ কাজই অনৈসলামিক! হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি' বা 'ইসলামিক সংস্কৃতি' বলে কিছু হতে পারে না।সংস্কৃতির সংজ্ঞার সাথে এগুলো যায় না। হিন্দু রীতি বা মুসলিম রীতি হতে পারে।এসব রীতি সংস্কৃতির অংশ মাত্র,সংস্কৃতি নয়। শুধু কয়েকটা ধর্মীয় রীতি বা প্রথা দিয়ে সংস্কৃতি হয় না। একটা অঞ্চলের মানুষের সামগ্রিক জীবনধারাটাই সেই অঞ্চলের সংস্কৃতি। ধর্মীয় উপাদান নিশ্চয়ই আমাদের জীবনের সমস্ত কিছু নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাবিত করে না। সুতরাং হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি' বা 'ইসলামিক সংস্কৃতি' একটা অলীক বস্তু বৈ কিছু নয়।

সংস্কৃতি গেলো বলে যারা সরগোল করছেন তাদের বলি যে সংস্কৃতি তো টুপ করে গাছ থেকে পড়ে না। ওটা দীর্ঘ দিনের চর্চায় গড়ে ওঠে এবং পরবর্তী প্রজন্ম তা শিখে নেয়, চর্চা করে। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই নাগরিক মানুষদের এই পান্তা ইলিশ খাওয়ার রীতিই একদিন সমগ্র বাঙ্গালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিনত হবে সাধারণ নিয়মেই। আজ হয়তো এটা শুধুই নগর সংস্কৃতির অংশ।কিন্তুু এটা শুধুই নাগরিক পরিধিতে আটকে থাকবে না।

এই যে দেশটা সহিষ্ণুতা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, উদারমনা সংস্কৃতি থেকে দিনকে দিন অসহিষ্ণু, উগ্র আর জঙ্গি সংস্কৃতির দিকে চলে যাচ্ছে তার বিরুদ্ধে দাড়িয়ে যাক বাংলা নববর্ষের সংস্কৃতি ।সকলকে বাংলা নববর্ষের পান্তা ইলিশ মার্কা অগ্রিম শুভেচ্ছা।

Comments

তাপস ভৌমিক এর ছবি
 

শুভ নববর্ষ..

 
সুবিনয় মুস্তফী এর ছবি
 

আপনাকেও নববর্ষের শুভেচ্ছা

কোন এক বোধ কাজ করে মাথার ভেতরে

 

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

সুবিনয় মুস্তফী
সুবিনয় মুস্তফী এর ছবি
Offline
Last seen: 20 ঘন্টা 30 min ago
Joined: শুক্রবার, নভেম্বর 4, 2016 - 4:58অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর