নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 2 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • আলমগীর কবির
  • মিঠুন বিশ্বাস

নতুন যাত্রী

  • চয়ন অর্কিড
  • ফজলে রাব্বী খান
  • হূমায়ুন কবির
  • রকিব খান
  • সজল আল সানভী
  • শহীদ আহমেদ
  • মো ইকরামুজ্জামান
  • মিজান
  • সঞ্জয় চক্রবর্তী
  • ডাঃ নেইল আকাশ

আপনি এখানে

ভূমিকার বিশ্লেষণ ও সমালোচনা। বইঃ আরজ আলী সমীপে, লেখকঃ আরিফ আজাদ (পর্ব ৭)



পুর্বের ৬ষ্ঠ পর্বের আলোচনায় আমরা “আরজ আলী সমীপে” বইটির ২২ নং পৃষ্ঠার প্রথম তিন লাইন পর্যন্ত আলোচনা শেষ করেছিলাম। তারপর থেকে এখানে আলোচনা হবে। তারপরেই লেখক “আরিফ আজাদ” বিজ্ঞানী রিচার্ড ডকিন্স এর একটি উক্তিকে ইসলাম ধর্মের জন্য একটি পজেটিভ উক্তি প্রমাণ করার ব্যার্থ চেষ্টা চালিয়েছেন। এই বইটির পাঠক মহলের অনেকেই হয়তো তা সঠিক যাচাই বাছাই না করে এটুকু পড়ে একটা ভুল ধারণা পেতে পারে। আসুন আমরা দেখি লেখক কি বলেছেন “জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় অবদানের কথা স্বীকার করতে গিয়ে বর্তমান সময়ের বিখ্যাত নাস্তিক রিচার্ড ডকিন্স একবার টুইট করেছিলেন এই বলে : “1000 years ago, the Islamic Golden Age embraced all the world's learning, books & science. Can we have a New Islamic Golden Age, please?” এটা ছিলো লেখকের পরের কথা ও “রিচার্ড ডকিন্স” এর টুইট। এখানে উল্লেখ্য যে, রিচার্ড ডকিন্স এখানে কোন ভাবেই ইসলাম ধর্মকে ইতিবাচক মনে করে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরের ১৮ তারিখে এই টুইট টি করেনি। এখানে কিন্তু বিজ্ঞানী রিচার্ড ডকিন্স প্রশ্ন করেছিলেন যেটা সবাই বুঝতে পারবে। তবে প্রশ্নের ভেতরে তিনি ১০০০ বছর আগে যে জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চায় ইসলামের একটি স্বর্ণ যুগ শুরু হয়েছিলো যা খুব অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আবার শেষ হয়ে গিয়েছিলো তা কি আবার ফিরে আসবে কিনা সেই কথাটি জিজ্ঞাসা করেছিলেন। এই সম্পর্কে আরেকটু ভালোভাবে জানতে গেলে আমাদের ইসলামের স্বর্ণ যুগ কি এবং কিভাবে তা শুরু হয়েছিলো আর কিভাবে তা শেষ হয়ে গেলো তা জানতে হবে। এখন আমি এই কথাটির ছোট্ট একটি ব্যাখ্যা দেবার পুর্বে এখানে আপনাদের আরেকটি বিষয় জানাতে চাই।

আসুন দেখি লেখক আরিফ আজাদ তার কোন মানুষিকতা থেকে রিচার্ড ডকিন্সের এই উক্তিটি টেনে আরজ আলী মাতুব্বরের উক্তিটির ভুল ব্যাখ্যা করেছেন যেটা একটি মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছুই নয় যেটা বুঝতে হলে আমাদের পরের লাইনে যেতে হবে। আর সেটা হচ্ছে “নাস্তিকরাও একথা অকপটে স্বীকার করে যে, ইসলাম কখনোই জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার, বিরুদ্ধে ছিল না; বরং জ্ঞান-বিজ্ঞানকে সম্প্রসারিত করার জন্য ইসলাম যা করেছে তা পৃথিবীর অন্য কোনো ধর্ম তা করেনি” এটা হচ্ছে তার পরের লাইন। এখানে পাঠক খেয়াল করে দেখবেন লেখক দুইটি ভুল কথা বলেছে। ১ হচ্ছে তিনি বলেছে যে, “নাস্তিকরা এ কথা অকপটে স্বীকার করে” আসল কথা হচ্ছে নাস্তিক (Atheist) বা যারা নাস্তিক্যবাদের চর্চা করে তারা কখনই যুক্তি বা প্রমাণ ছাড়া কিছুই বিশ্বাস করে না বা স্বীকার করেনা। আর ২ হচ্ছে “জ্ঞান-বিজ্ঞানকে সম্প্রসারিত করার জন্য ইসলাম যা করেছে তা পৃথিবীর অন্য কোনো ধর্ম তা করেনি” এই কথাটি যে সম্পুর্ণ একটি ভুল তথ্য তা আমরা যখন ইসলাম ধর্মের বিজ্ঞান ও নতুন নতুন প্রযুক্তির আবিষ্কারের তালিকা আর অন্যান্য ধর্ম, যেমন ইহুদী, খ্রিস্টান ও বেধর্মী নাস্তিক বিজ্ঞানীদের নতুন নতুন প্রযুক্তির আবিষ্কারের তালিকাটা পাশাপাশি রাখি তখনই পরিষ্কার দেখতে পারি যে ইসলাম ধর্ম কতটুকু অবদান রেখেছেন। এখানে আরেকটি কথা বলে রাখা ভালো, লেখকের ধারনা নাস্তিকরা আসলে সবসময় চাই ইসলাম ধর্মের অবদানের কথা অস্বীকার করতে বা ইসলাম ধর্মকে ছোট করতে বা ইসলামের ক্ষতি করতে যা আসলে আরিফ আজাদের একটি ভুল ধারনা।

আসল কথা হচ্ছে শুধু ইসলাম ধর্ম কেন, অন্যান্য যত ধর্ম আছে তার কোনটার মধ্যে যদি যুক্তি ও প্রমাণ থাকে এবং তা মানবতার জন্য কল্যানকর হয় তাহলে নাস্তিকরা সেই অবদানের কথা কখনই অস্বীকার করেনা। বরং যদি ইসলামের শত্রু খুজতে চান তাহলে আপনি ইসলামের মধ্যেই পেয়ে যাবেন আপনাকে ইসলাম ধর্মের বাইরে দেখতে হবেনা যেমন, একদল আরেকদলকে শত্রু মনে করে থাকে। আহমদিয়া, সুফীবাদী, শিয়া, সুন্নি, পীর আওলিয়া ইত্যাদি ইত্যাদি। এদের একপক্ষ আরেকপক্ষকে সবসময় বলে থাকে তারা ইসলামের শত্রু। এবার আবার চলে যাচ্ছি রিচার্ড ডকিন্স এর সেই টুইটে যেই উক্তিটি ইসলামের স্বর্ণ যুগের রেফারেন্স হিসাবে ব্যাবহার করেছিলো লেখক। ইসলামি স্বর্ণযুগ বলতে আমরা যা বুঝি তার শুরু আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশিদের সময় থেকে ৭৮৬ সালের দিকে। ১২৫৮ সালে মঙ্গোলদের দ্বারা বাগদাদ অবরোধের সময়কে এর শেষ ধরা হয়। ১৪৯২ সালে ইবেরিয়ান উপদ্বীপের আন্দালুসে খ্রিষ্টান রিকনকোয়েস্টার ফলে গ্রানাডা আমিরাতের পতনকেও এর সমাপ্তিকাল হিসেবে গণ্য করা হয়। আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশিদের (৭৮৬-৮০৯) সময় বাগদাদে বাইতুল হিকমাহর প্রতিষ্ঠার ফলে জ্ঞানচর্চার প্রভূত সুযোগ সৃষ্টি হয়। ফাতেমীয় যুগে (৯০৯-১১৭১) মিশর সাম্রাজ্যের কেন্দ্রে পরিণত হয় এবং উত্তর আফ্রিকা, সিসিলি, ফিলিস্তিন, জর্ডান, লেবানন, সিরিয়া, আফ্রিকার লোহিত সাগর উপকূল, তিহামা, হেজাজ ও ইয়েমেন এর অন্তর্গত ছিল। এই যুগে মুসলিম বিশ্বের রাজধানী শহর বাগদাদ, কায়রো ও কর্ডোবা বিজ্ঞান, দর্শন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, বাণিজ্য ও শিক্ষার বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্রে পরিণত হয়। আরবরা তাদের অধিকৃত অঞ্চলের বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের প্রতি আগ্রহী ছিল। হারিয়ে যেতে থাকা অনেক ধ্রুপদি রচনা আরবি ও ফারসিতে অনূদিত হয় যার কোনটিই আরবদের লেখা ছিলো না। আরো পরে এগুলো তুর্কি, হিব্রু ও ল্যাটিনে অনূদিত হয়েছিল। প্রাচীন গ্রিক, রোমান, পারসিয়ান, ভারতীয়, চৈনিক, মিশরীয় ও ফিনিশিয় সভ্যতা থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান তারা গ্রহণ, পর্যালোচনা ও অগ্রগতিতে অবদান রাখে যার কোন জ্ঞানই আরবদের নিজেদের জ্ঞান ছিলোনা ছিলো প্রাপ্ত জ্ঞান। আর বিজ্ঞানী রিচার্ড ডকিন্স বর্তমান সময়ের এই কুসংস্কারাচ্ছন ও সন্ত্রাসী সকল কার্যক্রমের প্রেক্ষিতে তার উল্লেখিত টুইটের মাধ্যমে হয়তো তিনি একবার জিজ্ঞাসা করেছিলো ১০০০ বছর আগে ইসলামে এই যে স্বর্ণ যুগের সৃষ্টি হয়েছিলো তা কি আবার কোনকালে ফিরে আসবে ? আর এটাই হচ্ছে আসল তথ্য।

আমার মতে যদি কোন কিছু প্রমাণ করার জন্য তথ্য সুত্র দেবার প্রয়োজন পড়ে তবে সেই তথ্যটি আগে ভালোভাবে যাচাই করে নেওয়া উচিৎ, যেই ভুলটি লেখক আরিফ আজাদ তার এই বই “আরজ আলী সমীপে”তে অনেকবার করেছে। এরপরের লাইনে লেখক আরিফ আজাদ লিখেছে “তা ছাড়া, ধর্মের সাথে বিজ্ঞানের যে দ্বন্দ্বের কথা আরজ আলী সাহেব উল্লেখ করেছেন, তা কতটুকু সত্য, যেখানে ফ্রান্সিস বেকন, কোপারনিকাস, গ্যালিলিও, আইনস্টাইন এবং নিউটনের মতো বিজ্ঞানীরা ধর্ম এবং ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করতেন” যারা উল্লেখিত নাম গুলির সাথে মোটামুটি পরিচিত সেই পাঠকরা এখানেও নিশ্চয় অবাক হচ্ছেন । আসল কথা হচ্ছে বিভিন্ন ধর্ম বিশ্বাসীরা যদি বিখ্যাত কোন দার্শনিক বা বিজ্ঞানীকে তাদের কাতারে নিতে পারে তাহলে তারা তাদের পায়ের নিচে একটু মাটি খুজে পায়। আর এখানেও সেই একই চেষ্টা করেছে লেখক যার শুধুই একটি কারন তা হচ্ছে “আরজ আলী মাতুব্বরের” কথা ভূল প্রামাণ করা। আসলে একটি কথা বলে রাখি এখানে। “আরজ আলী মাতুব্বর” তার সত্যের সন্ধানে, সৃষ্টি রহস্য সহ তার সকল বইগুলিতে যে যুক্তি উপস্থাপন করে গিয়েছেন তা মিথ্যা বা ভূল প্রমাণ করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। আমার কাছে মনে হয়েছে তা হতে পারেনা। বাকীটা আপনাদের উপরে যাচাই করে দেখার অনুরোধ রইলো। যদি কেউ ভুল প্রমাণ করার ব্যার্থ চেষ্টা করে তাহলে এই লেখক আরিফ আজাদের মতো তাকে মিথ্যাচার করতে হবে আর মিথ্যার আস্রয় নিতে হবে। আসুন এই উপরোক্ত বিজ্ঞানীদের সম্পর্কে একটু জানার চেষ্টা করি এবং যাচাই করে দেখি তারা কি ঈশ্বরে বিশ্বাস করতো না করতো না।

পৃথিবীর ইতিহাসে হাতে গোনা কয়েকজন বিজ্ঞানী পাওয়া যাবে যারা হয়তো নিজেদেরকে ঈশ্বর বিশ্বাসী বলে থাকলে থাকতে পারে। যেমন অনেক বিজ্ঞানীর দুই চারটা এমন উক্তি আমরা প্রায় দেখে থাকি যা ঈশ্বরের অস্তিত্বের পক্ষে কথা বলছে। আসল কথা হচ্ছে বিজ্ঞান, বা আধুনিক দর্শন আসলে ঈশ্বর আছে না নেই তা নিয়ে কখনই মাথা ঘামায় না। কারণ বিজ্ঞান ব্যস্ত মানুষকে সাচ্ছ্যন্দ আর মহাবিশ্বকে নিয়ে অনুসন্ধান করতে। যদিও একসময় ধর্মীয় আগ্রাসন সবচেয়ে বেশী হয়েছে বিজ্ঞানীদের উপরেই। আর সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, যদি পৃথিবীর সকল বিজ্ঞানী, দার্শনিক, ঈশ্বরে বিশ্বাসী হয় তবুও ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়ে যায় না। যদি কেউ বলে অমুক বিখ্যাতবিজ্ঞানী তমুক বিখ্যাত দার্শনিক ঈশ্বরে বিশ্বাস করতো তাই ঈশ্বর আছে তাহলে সেটা কি অযুক্তি বা কুযুক্তি নয় ? লজিক্যাল ফ্যালাসীতে “আ্যপীল টু অথরিটি ” বলে একটা কথা আছে। অযৌক্তিক কোন ব্যাখ্যা দিয়ে কেউ ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমান করতে চাইলে সেটা হবে বোকামি। অর্থাৎ বিজ্ঞানী দার্শনিকরা তাদের নিজস্ব ক্ষেত্রে সফল হলেও ধর্মতত্ত্ব বা ঈশ্বর সম্পর্কে তাদের ধারনা সঠিক নাও হতে পারে কারণ ঈশ্বর সম্পর্কে কোন দার্শনিক বা বিজ্ঞানী আজ পর্যন্ত এই পৃথিবীতে কেউ কোন তথ্য প্রমাণ হাজির করতে পারেনি।

প্রথমেই আসি স্যার ফ্রান্সিস বেকন এর কথায় যার জন্ম ২২শে জানুয়ারি, ১৫৬১ - মৃত্যু ৯ই এপ্রিল, ১৬২৬ ইংল্যান্ডে, যিনি ছিলেন, একাধারে একজন ইংরেজ দার্শনিক, আইনজ্ঞ, কুটনৈতিক এবং বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারার পথপ্রদর্শক। আইনজীবি হিসেবে পেশাগত জীবন শুরু করলেও তিনি বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের প্রবক্তা এবং জ্ঞানান্ধতা ও গোঁড়ামি বিরোধী হিসেবে সুখ্যাত হন। ফ্রান্সিস বেকনকে অভিজ্ঞতাবাদের জনক বলা হয়। তিনি দর্শনিক চিন্তাধারার কিছু মৌলিক তত্ব প্রবর্তন করেন যেগুলোকে বেকনিয়ান মেথডও বলা হয়ে থাকে। ফ্রান্সিস বেকনের মতে, "যে দর্শন আমাদের নাস্তিক্যবাদে উপনীত করে তা অত্যন্ত নিচু স্তরের দর্শন। কেননা, ছোট ছেলে যেমন ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠে এবং আগের জীবনের সবকিছুকে সন্ধেহ করতে শুরু করে, তেমনি করে মানব জ্ঞানের ক্রমন্নতির বর্তমান পর্যায়ে মানুষ ঈশ্বর সম্পর্কে অতীত কালের ধারণাকে সন্ধেহ করতে আরাম্ভ করে। কিন্তু নাস্তিকতাবাদে এর চরম পরিণতি দেখা যায়" আশা করি তার ধারনাটা সবাই বুঝতে পেরেছেন। তারপরেও, এখানে তিনি বলতে চেয়েছেন সময়ের সাথে সাথে মানুষের ঈশ্বর ধারনার বিস্তর পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু ঈশ্বর ধারনাটা যে একেবারেই বাতিল হয়ে গিয়েছে তা নয়। তার মতে ঈশ্বরের ধারনায় পরিবর্তন এসেছে শুধু ঈশ্বরের সংজ্ঞায়। এখন কথা হচ্ছে মুক্তচিন্তক, যুক্তিবাদী, আজ্ঞেয়বাদী, সংশয়বাদী, নাস্তিক, অবিশ্বাসী সহ আরো যত প্রকার মানুষিকতার মানুষ আজকের এই পৃথিবীতে আছে যারা ঈশ্বরের অস্ত্বিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে তাদের সুনির্দিষ্ট যুক্তি প্রমাণ বাদ দিয়ে যুগে যুগে মানব জ্ঞানের যে অগ্রগতি, মানব জ্ঞানের যে বিবর্তন তাকে নাস্তিকতার চরম পরিনতি বলে একেবারেই বন্ধ করে দেওয়া কতটা যুক্তিসংজ্ঞত ?

এবার বেকনের কিছু স্ববিরোধীতা দেখুন। ১৬২০ খ্রিস্টাব্দে বেকন প্রকাশ করেন 'গ্রেট ইনস্যাচুরেশন' নামক দ্বিতীয় একখানি মহামূল্যবান পুস্তক। বিজ্ঞানের ইতিহাসে এই পুস্তকের গুরুত্ব অনেকখানি। পুস্তকটির প্রথম খণ্ডে বেকন প্রচলিত বৈজ্ঞানিক তথ্যগুলো সংগ্রহ করে লিপিবদ্ধ করেন এবং নিজের মতামত ব্যক্ত করেন। এই খণ্ডে তিনি উল্লেখ করেন যে, বিজ্ঞানকে অগ্রগতি দান করতে হলে নতুন নতুন তত্ত্ব ও পদ্ধতির উদ্ভাবন করতে হবে এবং প্রাচীন বৈজ্ঞানিক মতবাদগুলি সংগ্রহ করতে হবে। পণ্ডিত ব্যক্তিরা যাতে এই কাজে এগিয়ে আসেন তার জন্যও তিনি অনুরোধ করেন। এখানে দেখুন তার আগের মতবাদের সাথে কি তার বই এর এই মতবাদটি যায় ? “বিজ্ঞানকে অগ্রগতি দান করতে হলে নতুন নতুন তত্ত্ব ও পদ্ধতির উদ্ভাবন করতে হবে” যায় হোক, এখানে আমি ছোট্ট করে বলতে চাই আমি লেখক আরিফ আজাদের "আরজ আলী মাতুব্বরের" যুক্তি খন্ডানোর মতো স্যার ফ্রান্সিস বেকনের যুক্তি খন্ডাতে চাইনা। আমি তার যুক্তির বিপক্ষে আমার দ্বিমত ও প্রস্তাবিত যুক্তি রাখছি বাকিটা পাঠক বিচার করে দেখবেন। এখন আসুন আমরা একটু ধারনা নেই ফ্রান্সিস বেকনের সময়ে তার আশেপাশের পরিবেশ কেমন ছিলো।

ষোড়শ শতাব্দীর দিকে ইউরোপে জার্মান ও ফরাসীরা যখন মুক্তবুদ্ধি ও স্বাধীন জ্ঞানের চর্চাকে চার্চ এবং গির্জার বাইরে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিলো ঠিক তখনি ইংল্যান্ডের জ্ঞান বিজ্ঞান বা দর্শন চর্চার প্রায় পুরোটায় ছিলো চার্চের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এবং যেহেতু ঠিক এই সময়ে ফ্রান্সিস বেকন ইংল্যান্ডের অধিবাসী এবং রাজার নিমন্ত্রন প্রাপ্ত একজন বিচার বিভাগের প্রধান ছিলেন তাই তৎকালীন ধর্মীয় আইনের বাইরে তার কিছু বলা বা মন্তব্য করা ছিলো ইংল্যান্ডের ধর্মীয় অনুভূতির জন্য হুমকিস্বরুপ, তাই তার মধ্যে চার্চ আর ঈশ্বরের প্রভাব থাকবে এটাই স্বাভাবিক, তবে এতেই কি প্রমাণ হয়ে যায় ঈশ্বর আছে ? তা কিন্তু আজো হয়নি। এখন যদি এমন একটা প্রশ্ন করা যায় যে, আমি কখনো ঈশ্বরের অস্তিত্ব যদি অনুভবই না করি তাহলে তাকে টেনে এনে জোর করে বিশ্বাস করা নিতান্তই অযৌক্তিক। কিন্তু দেখুন বিজ্ঞানীরা দিনের পর দিন নানাবিধ নতুন নতুর অনেক কিছু আবিষ্কার করছে যেগুলোকে আমরা অনুভব করতে পারিনা কিন্তু সেগুলো আমাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে। যেমন- আদিম কালে অতি ক্ষুদ্রাকায় ভাইরাস ব্যাক্টেরিয়া আমাদের রোগের কারণ সেটা আমরা জানতামনা বা অনুভবও করতাম না। খুব গোপনে এগুলো আমাদের জীবন নিয়ন্ত্রণ করত। বিজ্ঞানের উন্নতিতে আধুনিক সময়ে এসব আমরা জানতে পারি। ভবিষ্যতে যে এ ধরনের আরো কিছু বের হবেনা তার নিশ্চয়তা কে দিতে পারে। এসমস্ত নানা যুক্তি তর্ক, বিতর্কের নিচে আজ স্যার ফ্রান্সিস বেকনের সব কয়টি অস্ত্বিত্বহীন ঈশ্বরের ধারনা চাপা পড়েছে যার কারনে তার “ঈশ্বরের অস্ত্বিত আছে” যুক্তিকে কেউ রেফারেন্স হিসেবে টেনে আনে না। তবে একমাত্র ধার্মীক এবং ঈশ্বর বিশ্বাসীরা এরকম একজন দার্শনিক ও বিজ্ঞানীর ঈশ্বরে বিশ্বাসের বিন্দুমাত্র প্রমাণ যদি হাজির করতে পারে তাহলে তারা পায়ের নিচে মাটি খুজে পায় তাই লেখক আরিফ আজাদের এই ব্যার্থ চেষ্টায় আরজ আলী মাতুব্বরের যুক্তিখন্ডনে আজ এসেছে স্যার ফ্রান্সিস বেকন।

এরপরে লেখক আরিফ আজাদ যেই বিজ্ঞানীর নাম উল্লেখ করেছেন তিনি হচ্ছেন “নিকোলাস কোপারনিকাস” পলিশ ভাষায় মিকলজ কোপারনিক , জার্মান ভাষায় নিক্লাস কপারনিক, জন্ম ১৪৭৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারী মৃত্যু ২৪ মে ১৫৪৩ যিনি ছিলেন রেনেসাঁ এবং সংস্কার যুগের মহান গণিতবিদ এবং জ্যোতির্বিদ। তিনি এই মহাবিশের একটি মডেল তৈরি করেছিলেন। যেখানে তিনি পৃথিবী নয় বরং সূর্যকে সৌরজগতের কেন্দ্র হিসাবে উল্লেখ করেন। পবিত্র ঈশ্বর প্রদত্ত ধর্মীয় কিতাব বাইবেলের সাথে যার ছিলো একেবারেই অমিল। তিনি আঠারো শতকের আগে এমন একটি মডেল প্রনয়ন করেন যখন চারিদিকে সক্রেটিস এবং এরিস্টটলের মতবাদ চলছিল। তার মৃত্যুর কিছুদিন পরে কোপারনিকাস তার বই (দি রেভলিউসনিবাস অরবিয়াম কোয়েলেস্তিয়াম) বইটি প্রকাশ করা হয়। এই বইটি বিজ্ঞানের ইতিহাসের বড় একটি ভুমিকা পালন করে । এছাড়াও কোপারনিকান বিপ্লবের সৃষ্টি এবং বৈজ্ঞানিক বিপ্লবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। কোপারনিকাসের সময়টা ছিলো খ্রিস্টান ধর্ম ও চার্চের দাপটের সময়। কোপারনিকাস জন্ম এবং মৃত্যু একই জায়গা রয়েল ক্রোয়েশিয়াতে হয়েছিলো। ঠিক এরকম একটা সময়ে যখন সে তার মহাবিশ্বের মডেল তৈরি করে মানুষকে বোঝাতে শুরু করলো তখন তার মডেল অনুযায়ী বাইবেলের ভাষ্য সম্পুর্ণ মিথ্যা হয়ে দাড়াচ্ছিলো। ১৪৬৬ সালে পর্যন্ত পোল্যান্ড সম্রাজের অন্তর্ভুক্ত ছিল এই ক্রোয়েশিয়া। গোড়া ধার্মীক এবং খৃস্টান ধর্মের অন্ধবিশ্বাসীরা তখন এই অঞ্চলে পুরাদমে মাথা উচু করে ধর্মীয় মতবাদ একমাত্র সত্য ও সয়ং ঈশ্বর প্রদত্ত বানী বলে প্রাচার করে বেড়াতো।

ঠিক একই ঘটনায় “জিয়োর্দানো ব্রুনে”কে তো চার্চের সাজা স্বরুপ পুড়িয়ে মারা হয়েছিলো। যেটা ৪৬০ বছর পরে ১৯৯২ সালের ৩১ অক্টোবর রোমান ক্যাথলিক চার্চ ব্রুনোকে হত্যা করার জন্য ক্ষমা চেয়ে ব্রুনোর যুক্তি সঠিক ছিলো বাইবেল ভুল ছিলো তা স্বীকার করেছে। ব্রুনোকে তখন হত্যা করে কি সুর্যের চারপাশে পৃথিবীর ঘোরা কেউ বন্ধ করতে পেরেছিলো ? পারেনি। ঈশ্বরের বানী ভুল প্রামণ করার কারনে ব্রুনো কে হত্যা করার মতো ঘটনা যখন ঘটতে পারে ঠিক তখন ধর্মান্ধদের থেকে প্রচুর হুমকি ধামকি পেয়ে সব সময় মাথা নত করে চলেছেন নিকোলাস কোপার্নিকাস। কিন্তু মুক্তচিন্তার চর্চা তিনি ছাড়েনি। ধর্মান্ধদের ভয়ে সেই সময়ে ব্রুনোর মতো নিজিকে বিলিয়ে না দিয়ে নিজের জীবন রক্ষার জন্য হয়তো ভুল ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধর্মীয় মতবাদের হ্যাঁ তে হ্যাঁ মিলিয়েছেন। কিন্তু তিনি কখনই কোন ঈশ্বরে বিশ্বাসী ছিলেন না যেটা লেখক আরিফ আজাদ এখানে দাবি করে চেষ্টা করেছেন ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণের। নিকোলাস কোপার্নিকাস পরে ধর্মীয় গোড়ামীর বিপক্ষে প্রচার বন্ধ করে ১৫১৭ সালে অর্থের একটি পরিমাণ তত্ত্ব বের করেন যাকে অর্থনীতির প্রধান ধারণা বলা যায়। এছাড়াও ১৫১৯ সালে তিনি অর্থনীতির একটি সুত্র প্রদান করে যা পরবর্তীতে গ্রিসমের সূত্র নামে পরিচিত। বাকি অংশ পরের পর্বে......

এই পর্বটিতে শুধু বইটির ২২ নং পৃষ্টার প্রথম ও দ্বিতীয় প্যারা নিয়ে আলোচনা করে হয়েছে। বইটিতে যেভাবে আছে সেটা দেখুন এখানে।

পৃষ্ঠা ২২

মৃত কালপুরুষ
০৯/০৩/২০১৮

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

মৃত কালপুরুষ
মৃত কালপুরুষ এর ছবি
Offline
Last seen: 3 weeks 5 দিন ago
Joined: শুক্রবার, আগস্ট 18, 2017 - 4:38অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

কপিরাইট © ইস্টিশন ব্লগ ® ২০১৮ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর