নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 5 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • নুর নবী দুলাল
  • রাজর্ষি ব্যনার্জী
  • আসিফ মহিউদ্দীন
  • কান্ডারী হুশিয়ার
  • সাইয়িদ রফিকুল হক

নতুন যাত্রী

  • মিঠুন সিকদার শুভম
  • এম এম এইচ ভূঁইয়া
  • খাঁচা বন্দি পাখি
  • প্রসেনজিৎ কোনার
  • পৃথিবীর নাগরিক
  • এস এম এইচ রহমান
  • শুভম সরকার
  • আব্রাহাম তামিম
  • মোঃ মনজুরুল ইসলাম
  • এলিজা আকবর

আপনি এখানে

সহীহ মুসলমানের চেহারা (দ্বিতীয় পর্ব)


ধারাবাহিক উপন্যাস:
সহীহ মুসলমানের চেহারা
(দ্বিতীয় পর্ব)
সাইয়িদ রফিকুল হক

বন্ধুর বস্তিতে ফিরে আসতে তাইজুলের সময় খুব-একটা বেশি লাগেনি। এদিকটায় সরকারি কিংবা বেসরকারি অফিস বেশি না থাকায় বাসে ভিড়টাও কম। তাই, সে তাড়াতাড়ি এখানে ফিরে আসতে পেরেছে। কিন্তু এতো তাড়াতাড়ি এখানে ফিরে তার যেন সময় আর কাটতে চায় না। এখানে, সে তেমন কাউকে চেনে না। কথা বলার মতো মানুষজন তেমন নাই। সে পড়ালেখা কিছুটা জানে। তাই, সে সাধারণ রিক্সাওয়ালাদের সঙ্গে সহজে মিশতেও পারে না।

অচেনা জায়গা। আশেপাশে ঘুরাঘুরি করতে তার মন খুব-একটা সায় দেয় না। তার কারণ আছে।
ওর রিক্সাচালক-বন্ধু ইসমাইল বস্তির বাইরে ও-কে বেশি ঘোরাফেরা করতে নিষেধ করে গেছে। এখানে, মাঝে-মাঝে চাঁদা নিতে পুলিশ আসে। আর পুলিশ আসে নিয়মিত। তাইজুলকে বস্তিতে নতুন দেখতে পেয়ে পুলিশ কখন-কোন কেসে ফেলায় তার কোনো ঠিকঠিকানা নাই। এব্যাপারে পুলিশ খুব পারদর্শী। পুলিশরা চোর-ডাকাত ধরতে না পারলে কী হবে—তারা যেকোনোসময় মিথ্যা-কেস সাজিয়ে ভালোমানুষকে আটকিয়ে তাদের জিম্মি করে ঘুষ খেতে খুবই দক্ষ। এব্যাপারে তাদের পারদর্শিতার কোনো তুলনা নাই। ইসমাইলরা এদের হাড়ে-হাড়ে চেনে।

তাইজুল বন্ধুর কথা মনে করে চুপচাপ ছোট্ট একটা খুপরিতে চাটাইয়ের বিছানায় শুয়ে থাকে। এইসময় তার বাপের কথা খুব মনে হলো। বাপ তার আসার সময় কত করে বলে দিয়েছে ঘুষ না খেতে, আর ঘুষের পথে না যেতে। কিন্তু সে একজন রহিম-চাচাকে দেখে বুঝে গেছে—দুনিয়াটা কীভাবে চলছে—সে তার ক্ষুদ্রবুদ্ধিতে আরও ভালোভাবে বুঝতে পারলো বাংলাদেশটা সম্পূর্ণ ঘুষের উপর চলছে—তাতে তার মনে কোনো সন্দেহ নাই। সে তার স্বল্পবুদ্ধিতে আজ আরও বুঝতে পারলো—এখানে, ঘুষখোররা খুব সুখে আছে। আর ঘুষ না-খাওয়া সহজ-সরল মানুষগুলো খুব বিপদে আছে। আর এদের সংখ্যাটাও এখন কম। দেশটায় কী যে শুরু হয়েছে! সবখানে এখন যেন অপরাজনীতির ডামাডোলে শুধু ‘ধরো-মারো-খাও’ নীতি চলছে!

তাইজুল ভাবছিলো: তার দুপুরের খাবারটা এখানকার রিক্সাওয়ালাদের গণ-মেস থেকে জোগাড় করতে পারলে ভালো হতো। তাহলে, তার টাকা কম লাগতো। এখানে, খুব কম টাকায় খাওয়া যায়। সে কী করবে বুঝে উঠতে পারছিলো না। বাড়ি থেকে যে-কয়টা টাকা সে এনেছে—তা গুনে-গুনে খরচ না করলে তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাবে। তার বড় হিসাবের টাকা।
সে মনে করছে: ইসমাইল হয়তো ভাববে—সে চাচার সঙ্গে দেখা করতে গেছে—আজ আর হয়তো আসবে না। কিন্তু সেখানে গিয়ে সে যে কী পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে তা সে ছাড়া আর-কেউ জানে না। তার একসময় মনে হলো: খোদাই যেন দুনিয়ার পাপীদের আশ্রয়প্রশ্রয় দিচ্ছে। নইলে, এই ঘুষখোর-সুদখোর শয়তানগুলো মানুষের সহায়সম্বল কেড়ে নিয়ে আর দেশের সম্পদ লুটপাট করেও এতো দাপটের সঙ্গে চলাফেরা করছে কীভাবে? আর এদেরই কথায় দেশের সব জজ-ব্যারিস্টার, পুলিশ, এমপি-মিনিস্টার উঠাবসা করছে। সবখানে সে পাপীদের ছায়া দেখতে পেলো। দুনিয়ার কোথাও যেন ভালোমানুষের কোনো ঠাঁই নাই। তার আরও মনে হলো: দুনিয়াতে আজ ভালোমানুষ হওয়াটাই যেন বিরাটবড় অপরাধ!

দুপুরের ঠিক একটু আগে ইসমাইল বস্তিতে ফিরে এলো। তাকে দেখে তাইজুল এতো খুশি হলো যে তা সে কাউকে বোঝাতে পারবে না।
আর ইসমাইলও তাকে দেখে খুব অবাক হলো। আর বললো, “দোস্ত, কী রহম অইলো, এতো তাড়াতাড়ি চাচার বাড়ির বাত অজম অয়ে গেল!”
তাইজুল এবার খুব মনমরা হয়ে বন্ধুকে সবকথা একে-একে খুলে বললো।
ইসমাইল আস্তে-আস্তে তাইজুলের মুখ থেকে সব শুনে শেষমেশ বললো, “তয় কামডা তুমি ঠিক করো নাই। এইরহম একখান সুযোগ কেউ হাতছাড়া করে নাকি! ইরে বাপরে, তুমার চাচার কত ক্ষেমতা! পুরা হাইকোর্ট চালায় তিনি! আর এইরহম একখান লোকের মুহের উপর তুমি না কইরে দিয়ে আইছো! তুমার কপালে দুঃক্ষু আছে।”
বন্ধুর কথায় কিছু মনে করে না তাইজুল।
সে মনখারাপ করে বলে, “তা ঠিক। আমার কপালে দুঃক্ষই আছে। কিন্তু কী করবো, তুই ক। লোকটা ঘুষ ছাড়া আর-কিছু বোজে না। নইলে, পাঁচ লাখ টাহার জন্যি জোড়া খুনের আসামীক কেউ ছাইড়ে দেয়! তুইই ক। এমন পাজীব্যাটা—শালার ব্যাটা কোনোহানে আছে?”
এবার ইসমাইল হাসে আর বলে, “আছে। দুনিয়ায় এই পাজীব্যাটা—শালার ব্যাটারাই তো এহন রাজাবাদশাহ। দুনিয়াডা এগোরে আতের মুটোয়। এহানে তুই আর আমি কী করবো ক? এই শালার ব্যাটারা দুনিয়াডা জ্বালায় খাতিছে! তবুও এই শালারা মরে না। আর এই শালাগরে পাহারা দেয় আমাগরে দেশের পুলিশ!”

তাইজুল আগের মতো মনখারাপ করেই আবার বলতে থাকে, “আমি কী করবো ক? বাড়ি থেইকে আসার সময় আমার বাপ কত কইরে কয়ে দিছে—বাপ, ঘুষের কাছে যাবি না কিন্তু। ক, আমি এহন কী কইরতে পারি? কামডা কি আমি তাইলে বুল করছি?”
ইসমাইল এবার গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে বীরের মতো বলে, “তুই ঠিকই করছিস। আমি এতোক্ষণ তোর ঈমানপরীক্ষা করলাম রে। তাছাড়া, তুই লেহাপড়া জানিস। তুইতো আমার মতো রিক্সাও চালাইতে পারবি না। তাই, মনের দুঃখে তোরে কয়েক কতা কইলাম। তুই আবার কিছু মনে করিস নে। আর তুই যা করছিস—তা দুনিয়ায় সবাই করতি পারে না। তোরে এহন একখান মেডেল দেওয়া দরকার।”
তাইজুল এবার খুশি হয়ে হেসে বলে, “তা মেডেল লাগবি না। আপাততঃ চাইরডা বাত দিলিই খুশি। আমার খুব খিদা লাগছে রে, দোস্ত।”
ইসমাইল বলে, “হ, হেই সকালে কয়ডা খিচুরি খাইছিস। চল, আমরা আগেআগে খাইয়ে নিই।”
খুপরি থেকে বেরিয়ে ইসমাইলের পিছনে তাইজুল হাঁটতে লাগলো।

দু’জনে ঘরের কাছাকাছি একটা জায়গায় এলো। এখানে, রিক্সাওয়ালারা সবাই বসে খায়। ওরা দু’জন খেতে বসে গেল। খুব সাধারণ খাবার। তাই, দু’জনে গোগ্রাসে যেন গিলছে!
ইসমাইল খেতে-খেতে একজনকে হিসাবের খাতায় তাইজুলের নামটা লিখতে বলে দিলো।
সেই লোকটা তা-ই করলো।

খাওয়া শেষ করে ওরা দু’জন আবার বস্তির ঝুপড়িঘরে ফিরে এলো। দু’জন ভাগাভাগি করে ঝুপড়িঘরের ছোট্ট চাটাইটাতে শুয়ে থাকে। ঘরটাতে ফ্যান নাই। আর আলোও খুব কম। তবুও তাইজুলের কাছে এই পাওয়াটাই অনেকবড় মনে হয়।
ইসমাইল দরজার কাছে মুখ এগিয়ে নিয়ে একখান সস্তা-সিগারেট ধরিয়ে তাইজুলের উদ্দেশ্যে বলতে থাকে, “তোর ওই চাচা, শালার ব্যাটার কুনো মেয়েটেয়ে আছে নাকি রে?”
একথা শুনে তাইজুল কিছু না-বুঝে উদাস হয়ে বলে, “ক্যা?”
ইসমাইল বলে, “ক না। দরকার আছে।”
তাইজুল এবার বলে, “জানি না তো। জীবনে এই পরথম এই চাচারে দেইখলেম। বাইল্যকালে তারে দেখছি কিনা জানি না। এসব বাজান জানে।”
ইসমাইল এতে হতাশ হয়ে বলে, “তা-ই!”
তাইজুল বলে, “কিন্তু কেন? আমারে ইট্টু খুইলে ক তো?”
ইসমাইল এবার সিগারেটটায় শেষটান দিয়ে তাইজুলের দিকে চেয়ে চোখটিপে হেসে বলে, “চাচার একখান জোয়ান মেয়ে থাকলি কাম অইতো!”
তাইজুল বলে, “কী কাম?”
ইসমাইল বলে, “তুই তারে কুনোরহমে একবার ফাঁদে ফেলায় বিয়া করতি পারলে কাম খতম অইতো। তহন সারাজীবন বইসে খাইতে পারতি!”
তাইজুল এবার বলে, “নারে, সেরহম কাম আমারে দিয়ে হবে নারে। আমি এমন কাম কইরবের পারবো নারে। আমার মনে এতোকিছু নাই। আমার এহন যিডা দরকার—সিডা অইলো একখান চাকরি। এই চাকরির জন্যেই আমি ডাহায় আইছি।”
ইসমাইল বলে, “হ, তুই খুবই সোজা মানুষ। তোর একখান চারহিই দরকার।”
তাইজুল বলে, “তোর কোনো জানাশোনা কেউ আছে নাকি রে? যে আমারে একখান চাকরি দিতি পারবি! আমার কিন্তু চাকরি খুব দরকার রে।”
ইসমাইল কতক্ষণ কী যেন চিন্তাভাবনা করে শেষে বললো, “হ, আমার একখান দুঃসম্পর্কের মামু আছে। কিন্তু এই শালার ব্যাটাতো আবার মসজিদের নাকি ইমাম! তয় তার দিযে কি কিছু অবি?”

তাইজুল হতাশ না হয়ে বলে, “হইতে পারে। কারে দিয়ে কী হবি তা কিন্তু আগে থাকতি বোজা যায় না, সোনার চাঁদ। আর দূর থেইকে মানুষ বুজা যায় না। কাছে গেলি সব টের পাওয়া যায়।”
ইসমাইল বলে, “তাইলে দোস্ত, আইজ সন্দার পর তোরে তার কাছে নিয়ে যাবো নে। আমি ইট্টু পরে আবার রিক্সা চালাইতে বাইর অবো। তুই এহানেই থাক। আমি সন্দার আগেই আইসে পড়বো নে। তুই আবার বেশি চিন্তা করিস নে।”
তাইজুল বলে, “না।”
সে চিন্তা করবে না। আর সে এই প্রস্তাবে রাজী হয়ে সায় জানায়। তার এখন একটা চাকরির খুব দরকার। আর যে তাকে চাকরি দিতে পারবে—সে তার কাছেই যাবে।

ইসমাইল চলে যাওয়ার পর তাইজুল তার গ্রামের কথা ভাবতে-ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলো তা সে বলতে পারবে না। তার ঘুম ভাঙ্গলো ইসমাইলের কয়েক ডাকে।
সে ধড়মড় করে চাটাইয়ের উপর উঠে বসলো।
তারপর সে মাতালের মতো ইসমাইলের দিকে তাকিয়ে বলে, “এ আমি কনে আইসলেম রে?”
ইসমাইল হেসে বলে, “দোস্ত, তুমি চারহির জন্যি ডাহা আইছো। বেশি গুম পাইড়ে মনে অয় তুমার মাতা এহন আউলায় গেছে।”
কিছুক্ষণ পরে তাইজুল স্বাভাবিক হয়ে বলে, “হ, ঠিকই কইছো। তুমি চইলে যাওয়ার পর বিরাট একখান গুম দিছি। তাইতে এহন এরহম পাগল-পাগল লাগতিছে।”
ইসমাইল এবার তাগাদা দিয়ে বলে, “নে এবার ওঠ। আমার ওই মামু শালার ব্যাটার কাছে না যাওয়া লাগবি। দেহি শালার ব্যাটা তোর জন্যি কী করতি পারে।”
তাইজুল বলে, “হ, সে কতা তো গুমের জ্বালায় বুলেই গেছিলাম। তয় এহন চল।”

আগারগাঁও-বস্তি পার হয়ে ওরা বাংলাদেশ-বেতার-ভবনের পিছনের একটা রাস্তা ধরে হাঁটতে থাকে।
ইসমাইল একটু আগে তাইজুলকে বলেছে, “আগারগাঁও-আবহাওয়া-অফিসের কাছে ছোট্ট একটা মসজিদে ওর এই মামা নাকি ইমামতি করে। সে দীর্ঘদিন যাবৎ নাকি এখানে ইমামতি করছে।

হাঁটতে-হাঁটতে ইসমাইল একসময় আরও বলে, “দোস্ত শোন্, আমার এই মামু শালার ব্যাটা কিন্তু আমলীগ আর কমুনিস্ট না কী জানি কী কয়—তাগরে দুইচক্ষে দেখতে পারে না। সে যদি তোর সামনে আমলীগরে গালিগালাজ করে তুই আবার কিছু কইস না কিন্তু! শালার ব্যাটা মনে অয় একাত্তুরে রাজাকারই আছিলো।”
তাইজুল হতাশ হয়ে বলে, “আচ্ছা। আর চল, কাছে গিয়ে দেহি লোকটা কীরহম মানুষ!”
ইসমাইলও বলে “হ, তা-ই।”
আরও কিছুদূর এসে ইসমাইল বলে, “ওই মসজিদের মুয়াজ্জেম কিন্তু আমার দোস্ত মানুষ। আগে তার কাছ থেইকে সব খবর নেবো। তারপর মামু শালার ব্যাটার কাছে যাবো।”
তাইজুল এতে একটু হেসে বলে, “তোর যেমন ইচ্ছে কর। এতে আমার কোনো অসুবিদা নাই। আমার খালি একখান চাকরি দরকার।”

ওরা মসজিদের কাছে এসে দেখলো, মাগরিবের নামাজ অনেক আগে শেষ হয়ে গেছে। মসজিদে এখন কোনো মুসল্লীই নাই। কিন্তু একজন হুজুর খুব তন্ময় হয়ে এখনও নামাজ পড়ছে। আবছা-আলোতে দেখে ইসমাইল তাকে চিনতে পারলো না। আর সে মনে করলো: লোকটা কোনো দরবেশই হবে।
ইসমাইল মসজিদের আশেপাশে কাউকে দেখতে না পেয়ে হুজুরদের হুজরাখানায় এসে উঁকি দিতেই তাকে দেখে একজন ছোকরাবয়সী-লোক তার কাছে এগিয়ে এলো। আর সে ইসমাইলকে দেখতে পেয়ে এবং চিনতে পেরে বললো, “তা দোস্ত কী মনে কইরে এতোদিন পরে এখানে আইছেন?”
ইসমাইল হাসে আর বলে, “বহুদিন পরে আপনেরে আইজ খুঁজতি আইছি।”
তারপর সে তাকে তার মামার কথা জিজ্ঞাসা করতেই সেই লোকটি জানালো, “উনি তো এখনও মসজিদে নামাজ পড়তিছেন।”
এবার ইসমাইল তার বামপাশে বসা তাইজুলকে দেখিয়ে ওই লোকটার উদ্দেশ্যে বললো, “এও আমার একজন দোস্ত। আপনের মতোই সেও ডাহায় চারহি খুঁজতি আইছে।”
তারপর ইসমাইল একটু বামপাশে ঘুরে তাইজুলের দিকে তাকিয়ে বলে, “তুমারে আমার এই দোস্ত মুয়াজ্জেমের কতাই কইছিলাম। ইনি আমার আরেকখান দোস্ত। ইনিও বছর কয়েক আগে একখান চারহির জন্যি আমারই বস্তিতে আইসে উঠছিলো। আর এহন ইনি কতবড় মুয়াজ্জেম!”
ইসমাইলের কথা শুনে লোকটা বিনয়ে গলে গিয়ে বললো, “না-না, আমি ছোটখাটো একজন মানুষ।”

তাইজুল কথায়-কথায় জানলো—এই মুয়াজ্জিনের নাম হারুন। বাড়ি তাদেরই এলাকার আশেপাশে। তাই, সে নিজেদের এলাকার লোক পেয়ে খুবই খুশি হলো।
হারুনও খুশি হয়ে বললো, “আমরা তিনজনই এখন একই এলাকার লোক।”

ইসমাইল কথাবার্তার একপর্যায়ে মুয়াজ্জিন-হারুনকে তাদের দু’জনের এখানে আসার আসল কথাটা ধীরেসুস্থে সবিস্তারে জানালো।
এতে হারুন খুশি হয়ে বললো, “খুব ভালো কথা। আপনেরা হুজুরকে বইলে দ্যাখেন। আমি আপনাগরে সঙ্গে আছি।”
তারপর সে ভেবেচিন্তে একটু পরে আবার বললো, “হুজুরের তো অনেকের সঙ্গে জানাশোনা আছে। আপনেরা তাকে খুব ভালো কইরে ধরলি মনে হয় তার একখান চাকরি হইলেও হইতে পারে।”
এসব শুনে তাইজুল এবার আশায় বুক বাঁধে।

ইসমাইল একটু হেসে হারুনের দিকে চেয়ে বলে, “কিন্তু আমার এই মামু শালার ব্যাটা এহনও আসতিছে না ক্যা? আর কত দেরি করবি?”
কথাটা শুনে হারুন বলে, “তার মনে হয় আইজ ইট্টু দেরি হইতে পারে। কারণ, উনি তো আইজ ‘শোকরানা-রোজা’ রেখেছিলেন। তাই, ইফতারির পর তিনি সামান্য কিছু খেয়ে মসজিদে ঢুকেছেন। ইমামতি শেষ কইরে তিনি এখন নফল-নামাজ পড়তিছেন। আর কখন যে উনি মসজিদ থেকে আইজ বাইর হবেন—তা কেউ জানে। এদিকে উনি মাগরিবের নামাজের পরে বিনাপ্রয়োজনে উনাকে ডাকতে আমারে নিষেধও কইরে দিয়েছেন। তিনি গতকাইলও শুকরিয়া-আদায়ের জন্য নফল-রোজা রেখেছিলেন। আর গতকাইল রাইতে তো অনেক সময় পর্যন্ত তাহাজ্জুদের নামাজও পড়েছেন।”

এসব শুনে হঠাৎ তাইজুলের মনে খুব খটকা লাগে। আর সে চমকে ওঠে! আবার রহিম-চাচার মতো সেই শোকরিয়া-আদায়ের নামাজ না তো!
সে আর চুপ থাকতে না পেরে তার পাশে বসা ইসমাইলকে আস্তে করে বলে, “ঘটনাটা কী রে? তুই একটু ভালো কইরে শোনতো।”
ইসমাইল এবার হারুনকে বলে, “মামুর হঠাৎ এতো রোজা-নামাজের এই কারণ কী?”
হারুন প্রথমটায় কিছু বলতে চায় না। সে শুধু রহস্যময়ভঙ্গিতে হাসে। তবে তার হাসি দেখলে যেকেউ বুঝতে পারবে যে, এরমধ্যে কিছু-একটা আছে।
ইসমাইল এতে উৎসাহিত হয়ে আবার তাকে ঘটনাটা জিজ্ঞাসা করে। কিন্তু হারুন কিছুতেই কিছু বলতে চায় না।

শেষে ইসমাইল তাকে অনেক পীড়াপীড়ি করার পর হারুন বলে, “কিন্তু কথাটা যেন আর-কেউ জানে না বন্ধু। নইলে, হুজুর আমার উপর খুব ক্ষেপে যাবেন। আমি একজনের কাছ থেকে গতকাইল এই ঘটনাটা শুনছি। আমি তো এলাকার কয়েক বাড়িতে টিউশনি করি—তারাই আমারে ঘটনাটা কইছেন। তবুও আপনেরা কিন্তু এই ঘটনা কারও কাছে কইবেন না। আর আমার নামও কইবেন না। তাইলে, আমি ঘটনাটা কইতে পারি।”

কথাটা শেষ করে সে ওদের দু’জনের মুখের দিকে তাকায়। সে যেন ওদের সম্মতি চায়।
ব্যাপারটা ইসমাইল বুঝতে পেরে বলে, “আমরা কারও কাছে কিছুই কবো না। এবার কতাডা কী তা আপনে আমাগরে কাছে তাড়াতাড়ি কন তো দোস্ত।”

হারুন নিজের আসন থেকে উঠে প্রথমে হুজরাখানার দরজাটা আটকিয়ে দিলো। তারপর সে কোনো ভনিতা না করে একনাগাড়ে বলতে লাগলো:
“আমাগরে কামরুল-হুজুর এই মসজিদে প্রায় তেরো-বছর-যাবৎ ইমামতি করতিছেন। এলাকায় তার অনেক চেনাজানাশোনা। ইমামতির পাশাপাশি তিনি কয়েক বাড়িতে সন্ধ্যার পরে আরবিও পড়ান। এইরকম একটা বাড়ি হলো আমাগরে এই মসজিদ ছাইড়ে একটু দূরে। তিনি এইখানে একজন বিবাহিত-মহিলারে তিন-বছর-যাবৎ কুরআন-পড়ান। মানে, কুরআন-শিখান। এই মহিলার স্বামী আবার প্রায় চার-বছর-যাবৎ সৌদিআরবে থাকেন। মহিলা দেখতে খুব সুন্দর। তার বয়স খুব বেশি হলে চব্বিশ-পঁচিশ। আমাগরে হুজুর অনেকদিন যাবৎ এই মহিলার সাথে প্রেমট্রেম করার চেষ্টা করতিছিলেন। অবশেষে তিনি গত চার-পাঁচ-দিন আগে সফল হয়েছেন। মহিলার আত্মীয়স্বজনসহ তার ছোট-ছোট দুইটি ছেলে-মেয়ে এখানে থাকায় তিনি খুব-একটা সুবিধা করে উঠতে পারছিলেন না। কিন্তু গত চার-পাঁচ-দিন আগে তিনি ওই মহিলার একটা ফোন পেয়ে সেখানে যান। আর গিয়ে দেখেন, ওই মহিলার আত্মীয়স্বজন সব অন্যকোনো জায়গায় বেড়াতে গেছেন। আর এই সুযোগে আমাগরে এই হুজুর সেদিন রাতে ওই মহিলার সাথেই থাকেন। আর তার সাথে সহবাসে লিপ্ত হন। এভাবে, আমাগরে হুজুর ওই বাসাটা ফাঁকা পেয়ে পর-পর আরও তিন-রাত ওই মহিলার সাথে সহবাস করেছেন। আর এই খুশিতেই তো আমাগরে কামরুল-হুজুর গতকাইল থেইকে খুশিতে শুকরিয়া-আদায়ের জন্য তাহাজ্জুদের নামাজ, নফল-নামাজ পড়ছেন, আর নফল-রোজাও রাখছেন!”

সব শুনে ওরা দু’জন একেবারে হতাশ। ওদের কারও মুখে কোনো কথা নাই। ওরা কেমন যেন ভ্যাবাচাকা খেয়েছে।
ওরা কিছু বলছে না দেখে মুয়াজ্জিন-হারুন ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বলে, “আমাগরে কামরুল-হুজুর একখান জিনিস!”
এবার ইসমাইল যেন কিছুটা সম্বিৎ ফিরে পেয়ে বলে, “হ, মামু শালার ব্যাটা একখান জিনিস! এইডে আস্ত একটা নটীর ছাওয়াল!”
তারপর সে তাইজুলের দিকে তাকিয়ে বলে, “চলরে দোস্ত, এই হারামজাদা তোর চাচার চাইতেও আরও বড় শয়তান। এগুলার মুখ দেহাও পাপ!”
কথাটা বলে সে নিজেই হুজরাখানার দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলো। আর তাকে অনুসরণ করলো তাইজুল। আবছা-আঁধারে ওরা দু’জন মানুষ হেঁটে চলে। ওদের মাথার উপরে হাসে এক টুকরো চাঁদ।

(চলবে)

সাইয়িদ রফিকুল হক
পূর্বরাজাবাজার, ঢাকা,
বাংলাদেশ।
১১/১০/২০১৭

বিভাগ: 

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

সাইয়িদ রফিকুল হক
সাইয়িদ রফিকুল হক এর ছবি
Online
Last seen: 1 ঘন্টা 48 min ago
Joined: রবিবার, জানুয়ারী 3, 2016 - 7:20পূর্বাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর